দারিদ্র্যের চাপে দীর্ঘ হচ্ছে টিসিবির লাইন

শাহীন মোল্লা
শাহীন মোল্লা
সুকান্ত হালদার
সুকান্ত হালদার

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘড়িতে সময় তখন ২টা ১২ মিনিট। ঢাকার কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের নিচে রাস্তার পাশে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) একটি ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রাকের পেছনে মানুষের দীর্ঘ লাইন।

সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনার জন্য মূলত সীমিত ও নিম্ন আয়ের পরিবারের লোকেরা সেখানে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন। তাদের বেশিরভাগই নারী।

ট্রাক সেল কর্মসূচির আওতায় একজন ক্রেতা টিসিবির ট্রাক থেকে সর্বোচ্চ ১১৫ টাকা লিটার দরে দুই লিটার সয়াবিন তেল, ৭০ টাকা কেজি দরে দুই কেজি মসুর ডাল, ৮০ টাকায় এক কেজি চিনি, ৬০ টাকায় এক কেজি ছোলা এবং ৮০ টাকায় আধা কেজি খেজুর কিনতে পারেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে খরচ ৫৫০ টাকা।

সাধারণ বাজারে এসব পণ্য কিনতে খরচ প্রায় ৯৫০ টাকা। অনেকের কাছে এই ৪০০ টাকার সাশ্রয় খাবার জোগাড় করতে পারা আর না পারার মধ্যবর্তী সীমারেখা।

লাইনের পাশে একটি রিকশায় বসে ছিলেন ৪০ বছর বয়সী নাসির খান। রিকশার পাশে তার ক্রাচ ঠেক দিয়ে রাখা এবং বাম পা প্লাস্টারে মোড়ানো। একসময় তিনি বর্জ্যবাহী রিকশাভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রায় চার মাস আগে ভ্যানটি উল্টে গিয়ে তার পা থেঁতলে যায়। এরপর থেকেই তিনি কর্মহীন।

তিনি স্ত্রী মাহিনুর বেগমের সঙ্গে এসেছেন, যিনি তিনটি বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। মাসে আয় ৯ হাজার টাকা। স্বামী নাসিরের আয় না থাকায় স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়েকে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।

নাসির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘স্কুলে পড়া দুই মেয়েকে নিয়ে আমাদের এভাবে বেঁচে থাকা সত্যিই অসম্ভব। আমি যদি এই টিসিবি প্যাকেজ পাই, তবে এটি কিছুটা উপকারে আসবে।’ 

স্ত্রী মাহিনুর বারবার টিসিবি কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিলেন এবং অনুরোধ করছিলেন যেন তার অসুস্থ স্বামী দীর্ঘ লাইনে না দাঁড়িয়ে এই প্যাকেজটি পেতে পারেন। নাসিরের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে আধঘণ্টা পর ট্রাক থেকে তাদের হাতে প্যাকেজটি তুলে দেওয়া হয়।

কয়েক পা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের ডাব-বিক্রেতা মো. শাকিল। তিনি বেলা ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বেলা আড়াইটার দিকে তার প্যাকেজটি হাতে পান।

‘এই প্যাকেজের জন্য আমাকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই সময়ে আমার ডাবের দোকান বন্ধ ছিল। ফলে আমার লোকসান হয়েছে। তবুও, আমি ভাগ্যবান, শেষ পর্যন্ত প্যাকেজটি পেয়েছি।’

এই গল্পগুলো কঠিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশে সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এই খাদ্য মূল্যস্ফীতি জানুয়ারিতে বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

গত কয়েক মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ থেকে অক্টোবরে ৭ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে এলেও পরবর্তী তিন মাসে তা আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

বাজারের ক্রমবর্ধমান চাপ আরও পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা—দেশের দারিদ্র্য হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।

দৈনিক ২ দশমিক ১৫ ডলারের কম আয় করা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এই পরিস্থিতি আরও ৩০ লাখ মানুষকে চরম দুর্দশার মধ্যে ঠেলে দেবে। তবে প্রতিবেদনে ২০২৬ সালে কিছুটা স্বস্তির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) গত বছরের আগস্টে যে তথ্য উপস্থাপন করে, সেখানে এই বৃদ্ধির হার আরও ভয়াবহ। তথ্যমতে, বর্তমানে জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ দরিদ্র, যেখানে ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

চরম দারিদ্র্যে বসবাসকারী মানুষের হার তিন বছর আগের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে এ বছর ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো, প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন এবং প্রতি চারজনের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। এ ছাড়া ১৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

রমজানে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে টিসিবি দেশব্যাপী ট্রাক সেল কর্মসূচি শুরু করেছে। শুক্রবার এবং সরকারি ছুটির দিনগুলো ছাড়া আগামী ১২ মার্চ পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে।

টিসিবি কর্মকর্তারা জানান, কেবল রাজধানীতেই প্রতিদিন ৫০টি নির্ধারিত স্থানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। সারাদেশের ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাক প্রতিদিন নিম্নআয়ের ভোক্তাদের ভর্তুকি মূল্যে পণ্য সরবরাহ করছে, যার প্রতিটি ট্রাকে ৪০০টি পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত মালামাল থাকে।

২০ দিনের এই কর্মসূচির মাধ্যমে টিসিবি দেশব্যাপী আনুমানিক ৩৫ লাখ ভোক্তার মাঝে ২৩ হাজার টন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি খাদ্য বিতরণের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মন্ত্রণালয় ১৭ দশমিক ৬৪ লাখ টন খাদ্য বিতরণ করেছে। বিতরণের এই পরিমাণ বেড়ে ১৯ দশমিক ৯৩ লাখ টন হলেও ট্রাকের সামনে লাইনের দৈর্ঘ্য দিন দিন বেড়েই চলেছে।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

৭০ বছর বয়সী মুলকুচ বিবির কাছে টিসিবি ট্রাক কেবল একটি সরকারি কর্মসূচি নয়, বরং বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন।

বুধবার রাতে শোবার আগে তিনি বাজারের ব্যাগ আর পানির বোতল সাজিয়ে রাখছিলেন। ঘরে তার রান্নার তেল, চিনি ও ছোলা শেষ। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আগামীকাল যদি টিসিবি ট্রাক থেকে মাল কিনতে না পারি, তবে অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আর কেনা হবে না।’

সেহরি শেষ করে অল্প সময় বিশ্রাম নিয়ে তিনি পানি সংগ্রহ করেন এবং সকাল ৮টার কিছুক্ষণ পরই কাজীপাড়া মেট্রো স্টেশনের নিচে পৌঁছান। ততক্ষণে তার সামনে লাইনে আরও ৩৩ জন দাঁড়িয়ে গেছেন।

বার্ধক্যের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা তার জন্য কষ্টকর ছিল, তাই ক্লান্ত হয়ে এক পর্যায়ে তিনি মেট্রো স্টেশনের সিঁড়িতে বসে জিরিয়ে নেন। সকাল ১০টার দিকে ট্রাক আসে এবং দুপুরের দিকে তিনি পণ্যগুলো কিনতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী ২৭ বছর আগে মারা গেছেন। তারপর থেকে আমি মেয়ে আর মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গেই থাকি। ওরা দুজনেই গার্মেন্টস শ্রমিক এবং ওদের দুজনের আয়ে কোনোমতে সংসার চলে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনে যে টাকা বাঁচে, তা দিয়ে আমরা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারি। তা না হলে চলা খুবই কঠিন হয়ে যেত।’

ঢাকার আগারগাঁওয়ের মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা মিনুয়ারা বেগম সকাল ৯টায় শেরেবাংলা নগরের টিসিবি ট্রাকের সামনে এসে পৌঁছান। বাসায় তার সন্তানকে দেখাশোনা করার মতো কেউ না থাকায় তিনি তার এক বছর বয়সী শিশুটিকে সঙ্গেই নিয়ে আসেন।

লাইনে অপেক্ষার এক পর্যায়ে তাকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করাতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘বাসায় আমার বাচ্চাকে দেখার কেউ নেই, আর স্বামীর একার আয়ে সংসার চালানো খুব কঠিন। তাই টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে এসেছি এবং বাধ্য হয়ে সঙ্গে বাচ্চাকেও নিয়ে এসেছি।’

দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে ট্রাকটি সেখানে পৌঁছায় এবং আড়াইটার দিকে তিনি তার কেনাকাটা শেষ করেন।

দ্য ডেইলি স্টারের সাথে আলাপকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, গত তিন বছর ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ চরম চাপের মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষেরা।

‘মানুষের চাহিদার তুলনায় টিসিবির বর্তমান কার্যক্রমের পরিধি পর্যাপ্ত নয়। আমরা আশা করি, নতুন সরকার এই কার্যক্রমের আওতা আরও বাড়াবে এবং আরও বেশিসংখ্যক অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর উপায় খুঁজে বের করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক শ্রমজীবী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যার ফলে অনেক সময় তাদের অর্ধেক দিনের আয় নষ্ট হয়। এটি তাদের জন্য বাড়তি আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারা সহজেই এসব পণ্য পেতে পারেন।’

‘এমনকি রিকশাচালক, ছোট দোকানের কর্মচারী এবং অন্যান্য শ্রমঘন পেশায় নিয়োজিত অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদেরও এলাকাভিত্তিক কর্মসূচির আওতায় আনা উচিত। যেসব এলাকায় নিম্নআয়ের মানুষের বসবাস বেশি, সেখানে বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হলে তাদের কষ্ট কিছুটা কমবে এবং এই কঠিন সময়ে তারা স্বস্তি পাবেন।’

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য দ্য ডেইলি স্টার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পায়নি।