৬ লিজিং কোম্পানির আমানত ফিরে পেতে গ্রাহকদের ‘অন্তহীন’ অপেক্ষা

স্টার বিজনেস রিপোর্ট

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) থেকে অবসর নেওয়ার পর নিয়মিত আয়ের আশায় অবসরকালীন ১৬ লাখ টাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে জমা রেখেছিলেন এ কে এম আনসার।

আমানতের মেয়াদ পূর্ণ হলেও প্রতিষ্ঠানটি সুদ তো দূরের কথা, মূলধনও ফেরত দেয়নি। আনসার ওই অর্থ তিন সন্তানের জন্য, বিশেষ করে দুই মেয়ের বিয়ের ব্যয় বাবদ রেখেছিলেন।

আনসারের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও চিকিৎসার জন্য তিনি ওই অর্থ তুলতে পারেননি। গত বছরের নভেম্বর মাসে তার মৃত্যু হয়। আর্থিক সংকটের মধ্যে পরিবার মেয়েদের বিয়ে সাদামাটাভাবে সম্পন্ন করে।

জাতীয় প্রেসক্লাবে গতকাল ‘অ্যালায়েন্স অব সিক্স এনবিএফআইস ডিপোজিটরস রিকভারি কমিটি’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রয়াত এই সরকারি কর্মকর্তা স্ত্রী আখতারী বেগম তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। পাশে বসে ছিলেন তার ছোট ছেলে আনাফ উদ্দিন।

গত জানুয়ারিতে দেশে নয়টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তীতে এই তালিকা থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।

বছরের পর বছর ধরে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও খেলাপি ঋণের চাপের কারণে বেশ কয়েকটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ধস নামে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল তদারকি ও দেরিতে পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে সংকট আরও গভীর হয় এবং শেষ পর্যন্ত অবসায়নে গড়ায়।

সম্মানের সঙ্গে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া তার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল জানিয়ে আখতারী বেগম বলেন, ‘এখন সন্তানদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব তা অনিশ্চিত। অন্যদের কাছে সাহায্য চাইতেও পারি না। নিজেকে এখন প্রচণ্ড অসহায় মনে হচ্ছে।’

তিনি জানান, তার স্বামীর ৭ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। ঋণ না নিয়ে এই অর্থ চিকিৎসায় ব্যয় করার পরিকল্পনা ছিল, কারণ আনসার তার পরিবারের ওপর ঋণের বোঝা চাপাতে চাননি।

নজরুল সংগীত শিল্পী নাশিদ কামাল সংবাদ সম্মেলনটি সমন্বয় করেন। তিনি বলেন, সংগীত গবেষক মুস্তাফা জামান আব্বাসীসহ কিছু আমানতকারী তাদের অর্থ তুলতে না পারায় যথা সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন বলে জানা গেছে।

আরেক আমানতকারী বলেন, তার পরিবার চিকিৎসা ও সঞ্চয়ের জন্য রাখা অর্থ আভিভা ফাইন্যান্সে বিনিয়োগ করেছিল। ২০২৪ সাল থেকে তারা মুনাফা পাননি এবং মূল অর্থও তুলতে পারছেন না।

‘প্রতিষ্ঠানটিতে জরুরি চিকিৎসার আবেদন করেও ফল হয়নি। আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে,’ বলেন তিনি।

বেসরকারিভাবে অর্থায়িত দাতব্য সংস্থা খালেদ মনসুর ট্রাস্টের এক প্রতিনিধি জানান, ট্রাস্টটি দানকৃত অর্থ পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছিল।

তিনি বলেন, ‘এই বিনিয়োগের আয় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হতো। এই অর্থ হারিয়ে যাওয়ায় আমাদের মানবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।’

খালেদ মনসুর ট্রাস্টকে দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি এবং আমানতের অর্থ পুনরুদ্ধারে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, না হলে এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য তাদের কার্যক্রম ভেঙে পড়তে পারে।

বক্তারা বলেন, আমানতকারীদের অর্থ পুনরুদ্ধারে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ অনেক পরিবার চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে। তারা জানান, প্রায় ২ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনেকে সুদ তো দূরের কথা—মূলধনও পাননি।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে নাশিদ কামাল ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের পক্ষে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

তিনি বলেন, ‘প্রায় সাত বছর ধরে ব্যাংকবহির্ভূত বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীরা অব্যবস্থাপনা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিলম্বিত পদক্ষেপের কারণে চরম আর্থিক কষ্টে ভুগছেন।’

ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, আমানত সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা চালু হলেও এনবিএফআই খাতে একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।

‘আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, আমানতকারীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেকোনো পুনরুদ্ধার বা আমানত সুরক্ষা কাঠামো এনবিএফআই খাতেও প্রযোজ্য করতে হবে। ব্যাংক বা এনবিএফআই—যেখানেই হোক, আমানতকারী একই। উভয় খাতে সমান সুরক্ষা, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও সময় মতো অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে হবে,’ যোগ করেন তিনি।

অ্যালায়েন্স অব সিক্স এনবিএফআইস ডিপোজিটরস রিকভারি কমিটি ৩৬ মাসের মধ্যে আমানত ফেরতের জন্য স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও সময় সীমাবদ্ধ রোডম্যাপ, দুর্বল প্রতিষ্ঠানের দ্রুত পুনরুদ্ধার উদ্যোগ, ব্যাংকিং খাতের সমপর্যায়ের নিয়ন্ত্রক সুরক্ষা, অবসায়ন ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আর্থিক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার ও ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমরা সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই।’

‘আমাদের দাবি সহজ ও ন্যায্য’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমানতকারীদের ন্যায্য অর্থ পুরোপুরি পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত তারা আইনসম্মত আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।’

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, ছয়টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নসহ সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।