এক্সপ্লেইনার

যে কারণে সামরিক সচিবকে মোসাদের দায়িত্ব দিলেন নেতানিয়াহু

মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান
মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

ইসরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের নাম নানা কারণে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত। গোয়েন্দা উপন্যাস, রোমাঞ্চকর কাহিনী ও স্পাই থ্রিলারের পাতায় যেমন তাদের সরব উপস্থিতি, তেমনি বাস্তব পৃথিবীতেও তাদের কর্মকাণ্ড বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই সংস্থার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেই গোপনীয়তা রক্ষার গুরুদায়িত্ব বর্তায় মোসাদ প্রধানের ওপর।

প্রথাগতভাবে, মোসাদ প্রধান হিসেবে সাধারণত ওই গুপ্তচর সংস্থার কোনো সাবেক বা বর্তমান কর্মকর্তাকেই বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু এবার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

নিজের সামরিক সচিব রোমান গফম্যানকে এ কাজের জন্য বেছে নিয়েছেন পশ্চিমাদের ‘বিবি’ নেতানিয়াহু।

সর্বশেষ ২৪ বছর আগে এমন নজির দেখা গিয়েছিল। সে সময় আইডিএফের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মিয়ার দাগান এই দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

 

যেভাবে দৃশ্যপটে নতুন মোসাদ প্রধান


মোসাদ প্রধান হিসেবে গত পাঁচ বছরে বিশেষ ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন ডেভিড বার্নিয়া। বারবার এসেছেন সংবাদের শিরোনামে।

তেহরান ও এর মিত্রদের কাছে ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। হামাসের শীর্ষ নেতা মুহাম্মদ দেইফ ও ইসমাইল হানিয়া, হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ থেকে শুরু করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি—সবার হত্যার পেছনেই আছে বার্নিয়ার হাত। এমনটাই বলেন বিশেষজ্ঞরা।

আগামী জুনে বার্নিয়ার চাকরির মেয়াদ শেষ হবে। সব মিলিয়ে কতটা ‘সফল’ ছিলেন, তা ইতিহাসই বিচার করবে।

ইতোমধ্যে নতুন মোসাদ প্রধানকে বেছে নেওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তার নাম রোমান গফম্যান।

গত ডিসেম্বরে রোমান গফম্যানকে বার্নিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেন নেতানিয়াহু। গত রোববার তার নিয়োগ আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়।

কিন্তু এত মানুষ থাকতে কেন বিবেচনার বাইরে থাকা এই ব্যক্তিকে বেছে নিলেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযুক্ত নেতানিয়াহু? আজকের এক্সপ্লেনারে এর জবাব খোঁজা হবে।

 

অভিবাসী থেকে কট্টর জায়নবাদী
 

সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল রোমান গফম্যানের গুপ্তচরবৃত্তির অভিজ্ঞতা নেই। এমন কী, সামরিক গোয়েন্দা বিভাগেও কাজ করেননি তিনি। ছিলেন পদাতিক সেনা।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আগামী ২ জুন মোসাদ প্রধানের দায়িত্ব নিতে চলেছেন তিনি।

মজার বিষয় হলো, জন্মসূত্রে ইসরায়েলের নাগরিক নন তিনি। ১৯৭৬ সালের ৩০ নভেম্বর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ও বর্তমানে বেলারুশের মোজাইর-এ জন্ম নেন রোমান।

১৯৯০ সালে তিনি পরিবারের সঙ্গে ইসরায়েলে এসে বসতি করেন।

ইসরায়েলি গণমাধ্যম ওয়াইনেট ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল রোমান গফম্যানের বেড়ে ওঠার গল্প নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

রোমানের মা শিক্ষক; বাবা ভ্লাদিস্লাভ বেলারুশে অ্যানেস্থেসিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। পরবর্তীতে একটি রুশ হাসপাতালে উপ-পরিচালকের দায়িত্ব পান তিনি। ইসরায়েলে আসার পর তিনি শুরুতে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন।

প্রতিবেদন অনুসারে—নব্য অভিবাসী হিসেবে আশদদ শহরে ঝামেলাপূর্ণ সময় কাটান রোমান গফম্যান ও তার পরিবার। শিশুকাল থেকেই বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার রোমান বক্সিং-এ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিজের ওজন-শ্রেণিতে শীর্ষ র‍্যাংকিং অর্জন করেন তিনি।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রোমান গফম্যান সেনা ক্যারিয়ারে বক্সিং কোচের ইতিবাচক ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।

কোচের মূলনীতি ছিল, ‘যখন হুমকি বা বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামনে আসবে, তখন চোখ বন্ধ করে রাখলে চলবে না।’ রোমানের দাবি, সেনা অধিনায়ক হিসেবেও তিনি এই মূলনীতি বজায় রাখেন।

নিজের ইসরায়েলি পরিচয়কে পূর্ণতা দিতে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন এবং জায়নবাদ ও ইসরায়েলি ইতিহাসের ওপর পড়াশোনা করেন।

১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী রোমান গফম্যান ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে সফল ও দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন।

তিনি ধর্মপ্রাণ ইহুদিদের মতো ‘ইয়াহমিকু’ টুপি পরেন না। তবে তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিতে এক ইহুদি ধর্মীয় বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ডানপন্থি জায়নবাদী হিসেবে পরিচিত।

একজন ‘জায়নবাদী ইসরায়েলি’ হিসেবে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠায় অনেক ‘কাঠ-খড়’ পুড়িয়েছেন রোমান। তার এসব উদ্যোগ নেতানিয়াহুর নজরে এসেছে বলেই মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।


হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই


২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস হামলা চালায়। সেদিনই হামাসের কয়েকজন যোদ্ধার বিরুদ্ধে লড়াই করেন রোমান গফম্যান।

২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ইসরায়েলি গণমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের এ বিষয়ে এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, তিনি হামাসের হামলার সময় তেজিলিম জাতীয় পদাতিক সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কমান্ডার ছিলেন।

হামাস যোদ্ধারা ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছে—এই তথ্য পেয়ে আশদদ শহরে নিজের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন রোমান। গাড়ি হাঁকিয়ে গাজার সীমান্তের কাছে সেদেরত শহরের দিকে রওনা দেন। পথে পুলিশের স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে হামাস যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।

কোনো ধরনের বর্ম বা বুলেট প্রুফ পোশাক ছাড়াই নিজের অ্যাসল্ট রাইফেল দিয়ে পাল্টা হামলা চালান রোমান।

এক পর্যায়ে হাঁটুতে গুলি লাগে তার। ওইদিনের হামলায় আহত আইডিএফ সেনার মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) কর্মকর্তা।

 

নেতানিয়াহুর ‘কাছের মানুষ’
 

হামাসের সঙ্গে লড়াই করে আহত হওয়ার পর ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে সামরিক সচিব হিসেবে যোগ দেন রোমান।

কয়েকজন বিশ্লেষকের মত, ‘বীরত্বের’ পুরষ্কার হিসেবেই তাকে এই পদে নিয়ে আসেন নেতানিয়াহু।

এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, তিনি নেতানিয়াহুর কট্টর জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার প্রতি সহানুভূতিশীল।

টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়—নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই মূলত এই পদ পেতে যাচ্ছেন রোমান গফম্যান।

প্রায় দুই বছর নেতানিয়াহুর সামরিক সচিব হিসেবে কাজ করেছেন রোমান। আইডিএফের প্রতি নেতানিয়াহুর যাবতীয় নির্দেশ ও নির্দেশনা সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে কী না, তাও দেখভাল করেন তিনি।

২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রোমান গফম্যানকে বেছে নিতে মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার সুপারিশ করা দুই প্রার্থীকে উপেক্ষা করেছেন নেতানিয়াহু।

২০০২ সালের পর এবারই প্রথম ‘মোসাদের বাইরে থেকে’ মোসাদ প্রধান নিয়োগের নজির তৈরি করলেন নেতানিয়াহু।


নতুন চিন্তাধারার ধারক-বাহক
 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলার বিষয়ে আগাম বার্তা বা গোয়েন্দা তথ্য পায়নি তেল আবিব। এ কারণে অনেক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা তোপের মুখে পড়েন।

আইডিএফ প্রধান ও সামরিক গোয়েন্দা প্রধান পদত্যাগ করেন। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী শিন বেত প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী—উভয়কেই বরখাস্ত করেন নেতানিয়াহু।

বৈদেশিক গুপ্তচর বাহিনী হওয়ায় ছাঁটাইয়ে খুব একটা প্রভাবিত হয়নি মোসাদ।

তবে হামাস যেহেতু ইরানের সমর্থনপুষ্ট, খানিকটা দায় ডেভিড বার্নিয়াকেও নিতে হয়।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে ‘আনকোরা’ কাউকে নিয়োগ দিয়ে থাকতে পারেন নেতানিয়াহু।


নিয়োগে বিতর্ক


সার্বিকভাবে, মোসাদ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, জল্পনাকল্পনার কমতি নেই, থাকবেও না। শিশু নিপীড়নকারী জেফরি এপস্টাইন মোসাদ এজেন্ট ছিলেন—এমন কথাও জোরেশোরে শোনা গেছে। ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন মোসাদের উসকানিতে শুরু হয়েছে, এমন তথ্যও প্রচার করা হয়েছিল তেহরানের পক্ষ থেকে।

রোমানের নিয়োগ নিষ্কণ্টক ছিল না। তার নাম আলোচনায় আসার পর ইসরায়েলে সংবেদনশীল পদে কর্মী নিয়োগের নীতি অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ নিয়োগ উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটির আলোচনায় ২০২২ সালে সিরিয়া সীমান্তে গোলান মালভূমিতে মোতায়েন করা ২১০তম ‘বাশান’ আঞ্চলিক সেনা ডিভিশনের কমান্ডার থাকা অবস্থায় রোমানের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড উঠে আসে।

কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি আশের গ্রুনিস মত দেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক এক ইসরায়েলি বালককে ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে পরবর্তীতে দায় স্বীকার না করার অপরাধ করেছেন রোমান। ফলে মোসাদ প্রধান হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন তিনি।

তবে কমিটির অন্য তিন সদস্য তার নিয়োগে সায় দেয়। তাই আগামী জুনে ‘নেতানিয়াহুর কাছের মানুষ’ রোমান গফম্যান মোসাদ-প্রধান হতে চলেছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ পদে কেমন করেন তিনি, সেটাই এখন দেখার বিষয়।