বিদেশে বারবার শুল্কের মুখে বাংলাদেশি পণ্য, সুরক্ষায় পিছিয়ে দেশ: বিএফটিআই
অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের পণ্যের বিরুদ্ধে একের পর এক অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা নিলেও বাংলাদেশ নিজে এ ধরনের বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা খুব কমই ব্যবহার করেছে। অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড শুল্ক—এই তিন ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহারে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখনও সীমিত বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) এক গবেষণা।
অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড শুল্ক হলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) অনুমোদিত তিন ধরনের বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা। কম দামে পণ্য বিক্রি, সরকারি ভর্তুকির সুবিধা নিয়ে রপ্তানি বা হঠাৎ আমদানি বেড়ে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গবেষণাটি বলছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা কমে গেলে দেশের শিল্পকে বিদেশি পণ্যের অসম প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করতে এসব ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এমন সময়ে এই গবেষণার তথ্য সামনে এল, যখন ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার মহাপরিচালকের দপ্তর (ডিজিটিআর) বাংলাদেশ, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে রপ্তানি করা পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি) ফিল্মের বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত করছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে শুনানিতে অংশ নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
ভারত এরই মধ্যে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর থাকা অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা শেষ করেছে।
গত ২৫ জুন প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো বদলে পণ্য ও উৎপাদনকারীভেদে আলাদা শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে। বর্তমানে এসব পণ্যে প্রতি টনে শূন্য থেকে ৩৫১ দশমিক ৭২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে এই শুল্ক কার্যকর।
নতুন সুপারিশ অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ বাংলাদেশি উৎপাদনকারীকে পাটের সুতা ও টোকাইনির ক্ষেত্রে প্রতি টনে ৬৯ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগের ক্ষেত্রে ১২০ ডলার শুল্ক দিতে হবে।
আর যেসব উৎপাদনকারীর নাম আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত নেই, তাদের জন্য পাটের সুতা ও টুইনে প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগে ২৮৩ ডলার শুল্ক দিতে হবে।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় কাস্টমস সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করার পরই নতুন শুল্ক কার্যকর হবে।
বিএফটিআইয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের আরও চারটি রপ্তানি পণ্য বিদেশে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের মুখে পড়ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা দেশ এই শুল্ক আরোপ করেছে।
পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের ওপর বেশির ভাগ রপ্তানিকারকের জন্য ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। তবে কিছু নির্দিষ্ট কোম্পানির জন্য শুল্কের হার কম। ২০২১ সালের অক্টোবরে পর্যালোচনা শেষে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তুরস্ক কৃত্রিম তন্তুর সুতা আমদানিতে প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ৮০ ডলার শুল্ক আরোপ করেছে। আগের একটি বাণিজ্য ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগের তদন্তের পর এই শুল্ক দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশের একটি কোম্পানিকে এ শুল্কের বাইরে রাখা হয়েছে।
আর্জেন্টিনা শতভাগ বোনা কাপড় দিয়ে তৈরি গ্লাভসের ওপর ৪২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এই শুল্ক ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর।
ব্রাজিল বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটের বস্তা ও ব্যাগের ওপর প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ১৬ ডলার শুল্ক নেয়। ১৯৯২ সাল থেকে এই ব্যবস্থা চালু আছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে এটি পর্যালোচনা করা হয়।
বিএফটিআইয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এসব দেশ বাংলাদেশি পণ্যের বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত করেছে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) জন্য করা এই গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। কারণ চলতি নভেম্বরেই দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার কথা।
এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশ এত দিন পাওয়া শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধাসহ বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা হারাবে।
বিএফটিআইয়ের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে দেশটি আমদানি নিয়ন্ত্রণে এত দিন ব্যবহার করা কিছু প্রচলিত ব্যবস্থা ধীরে ধীরে হারাবে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ন্যূনতম শুল্কমূল্য।
এ অবস্থায় ডব্লিউটিওর নিয়ম মেনে অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড শুল্কের মতো ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। এসব ব্যবস্থা দেশের শিল্পকে অন্যায্য বাণিজ্য থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশি পণ্যের বিরুদ্ধে তদন্ত হলে রপ্তানিকারকদেরও সহায়তা করবে।
বিএফটিআই সতর্ক করে বলেছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর দেশের শিল্পগুলোকে আরও বেশি বিদেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। কম দামে পণ্য রপ্তানি, সরকারি ভর্তুকি পাওয়া পণ্য এবং হঠাৎ করে আমদানি বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণ করতে থাকায় বাংলাদেশের আমদানি শুল্ক ধীরে ধীরে কমাতে হবে।
বিএফটিআইয়ের গবেষক হারুনুর রশীদ শামস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বর্তমান শুল্ক ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা দরকার। বিভিন্ন ধরনের বাড়তি শুল্ক দিয়ে সুরক্ষা দেওয়ার বদলে আরও স্বচ্ছ, তথ্যনির্ভর এবং ডব্লিউটিওর নিয়ম মেনে বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্যারা-ট্যারিফ বলতে কাস্টমস শুল্কের বাইরে আমদানির সময় নেওয়া বিভিন্ন ধরনের ফি বা করকে বোঝায়।
শামস বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে দেশের শিল্পকে সুরক্ষা দিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড শুল্ক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিগুলোও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিদেশে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের বিরুদ্ধে তদন্ত হলে তাদের সহায়তা করার জন্যও এসব বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
শামস বলেন, অন্যায্য বাণিজ্য শনাক্ত করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিটিটিসির বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, পণ্যের উৎপাদন খরচ বিশ্লেষণকারী বিশেষজ্ঞ, বাণিজ্য আইনজীবী এবং আধুনিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশ্বাসযোগ্য শিল্প সংগঠনগুলো যাতে নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য নিরাপদভাবে পেতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা দরকার। এতে তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়বে, আরও ভালোভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে এবং বাণিজ্য সুরক্ষার তদন্তও আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে।