বন্ধ কারখানা খুলতে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ, ৩ মাসে ছাড় হয়নি এক টাকাও
বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ কারখানা চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ তহবিল চালু করেছিল। কিন্তু সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এ তহবিল থেকে এখনো এক টাকাও ছাড় হয়নি। কারণ স্বল্পসুদের এই ঋণ পেতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ বন্ধ কারখানাই বর্তমানে ঋণখেলাপি।
এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জ্বালানি পাবে কি না এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে টিকে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে।
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংক খাতের এক বিশেষজ্ঞ নমনীয় নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তিনি বলেছেন, অর্থ দেওয়ার আগে ভালোভাবে যাচাই করতে হবে, যেন শুধু সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোই ঋণ পায়।
বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনরুজ্জীবিত করতে গত ২৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হলো বন্ধ কারখানার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল।
এই তহবিলের নীতিমালা জারি হয় ৪ জুন। পরে ধাপে ধাপে অন্য খাতগুলোর জন্যও কর্মসূচি চালু করা হয়।
প্যাকেজ ঘোষণা করার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছিলেন, পুরো কর্মসূচির মাধ্যমে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
নীতিমালা অনুযায়ী, বন্ধ কারখানাগুলো প্রথমে বাণিজ্যিক ব্যাংকে আবেদন করবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ আবেদন যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দিলে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে অর্থ ছাড় করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এ পর্যন্ত ৪১টি ব্যাংক এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে এবং তারা আবেদন গ্রহণ করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রণোদনা তহবিলের ঋণ পেতে হলে আগে বিদ্যমান ঋণ নিয়মিত করতে হবে। এরপরই আবেদন করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ঋণ নিতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্যাস, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১০০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া ঋণ রয়েছে, এমন এক হাজারের বেশি আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ কারখানার তালিকা ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়েছে।
গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস (আরএসআরএম) পরিদর্শনে গিয়ে সমস্যার বাস্তব চিত্র দেখতে পায় দ্য ডেইলি স্টার।
২০১৯ সালে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে। ফলে তারা এ তহবিলের জন্য আবেদন করতে পারেনি।
আরএসআরএমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন করেছে।
তিনি বলেন, মূল ঋণের পরিমাণ ছিল এক হাজার কোটি টাকার কম। কিন্তু বছরের পর বছর সুদ জমে দায় অনেক বেড়ে গেছে।
মিজানুর রহমান বলেন, গত দুই দশকে আমরা প্রায় ৮৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করেছি। কিন্তু সুদসহ এখন ব্যাংকগুলো আরও প্রায় এক হাজার কোটি টাকা দাবি করছে। নানা কারণে পুরো ঋণই এখন খেলাপি হয়ে গেছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আরএসআরএম বড় ঋণখেলাপি এবং এর কারণে ব্যাংকের লালদিঘী করপোরেট শাখার আর্থিক অবস্থাও খারাপ হয়েছে।
বন্ধ কারখানার ঋণ বিতরণে ধীরগতির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমে পুরোনো ঋণ নিয়মিত করতে হবে। এরপরই তারা প্রণোদনার ঋণ পাবে। এ কারণেই প্রক্রিয়াটি ধীরে এগোচ্ছে।
আগের ভর্তুকিভিত্তিক ঋণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতাও ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে তুলেছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, কোভিডের সময় আমরা অনেক ঋণ দিয়েছিলাম। তার বড় একটি অংশ এখনো আদায় হয়নি। এ তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে পুরোনো ঋণ সমন্বয় বা পরিশোধ করা যাবে না।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, শুধু চলতি মূলধন দিলেই হবে না। একটি গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান চালু করা সহজ হতে পারে। কিন্তু পুরো গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে সেগুলো আবার চালু করা অনেক কঠিন।
তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মূলধন, অবকাঠামো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জ্বালানি সরবরাহ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। অবকাঠামো কার্যকর আছে কি না, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
এসব ব্যবস্থা না থাকলে শুধু টাকা দিয়ে কারখানা চালু করা সম্ভব হবে না বলে তিনি মনে করেন।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানান, তাদের ব্যাংকে এ পর্যন্ত ১৯৩টি আবেদন জমা পড়েছে।
এর মধ্যে পাঁচটি আবেদন পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন করেছে এবং সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।
এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, অনেক বন্ধ কারখানার মালিক পলাতক বা বিদেশে অবস্থান করছেন। ফলে কে ঋণের জন্য আবেদন করছেন, সেটিও একটি প্রশ্ন।
তিনি বলেন, কিছু কারখানা গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি সংকটের কারণে বন্ধ হয়েছে। এসব উদ্যোক্তা পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। যদি প্রকৃত উদ্যোক্তারা আবার ব্যবসা চালু করতে চান এবং তাদের সক্ষমতা থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলো আরও সহায়তা দিতে পারে।
আনিস এ খান বলেন, ভালোভাবে যাচাই করে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন করা হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, জিডিপিতে অবদান রাখবে এবং সরকারের কর আয়ও বাড়বে।
তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক আরও নমনীয় হতে পারে। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলো ব্যতিক্রমী সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। বর্তমান গভর্নরের সময়েও কিছু ক্ষেত্রে এমন নমনীয়তা দেখানো হয়েছে।
আনিস এ খান বলেন, যৌক্তিক কারণ থাকলে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে বিশেষ ছাড় চাইতে পারে।


