ইরফান খান: বলিউডের পর্দা থেকে হলিউড জয়
২০২০ সালের ২৯ এপ্রিল, বিশ্ব তখন করোনা মহামারিতে ভুগছে। সেই ভয়ংকর সময়ে নিভে যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি হলেন ইরফান খান। তার মৃত্যুতে কেবল বলিউডের নয়, বিশ্ব সিনেমায় এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।
ইরফান খানের যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। ছোট পর্দা পেরিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন হলিউডের বিশাল মঞ্চেও। প্রতিভা, অধ্যবসায় ও চরিত্র বেছে নেওয়ার তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিলেন। সেই গল্প উঠে এসেছে অসীম ছাবরার লেখায়।

২০০৭ সালের কথা। মাইকেল উইন্টারবটম পরিচালিত ‘আ মাইটি হার্ট’ সিনেমার প্রচারণায় ইরফান তখন নিউইয়র্কে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি ড্যানিয়েল পার্লের অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে নির্মিত হয়েছিল এই সিনেমা।
সিনেমার অভিনয়শিল্পীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছিল। অ্যাঞ্জেলিনা জোলিসহ অন্য সহশিল্পীদের সঙ্গে ইরফানও সেখানে ছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারের ভিড়ের মধ্যেই অসীম ছাবরাকে একপাশে ডেকে নেন ইরফান।
হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করলেন অভিনেতা। তিনি জানতে চাইলেন, সেখানে বিশেষ কিছু হচ্ছে কি না, মানুষ তাকে চিনতে পারছে কি না কিংবা পশ্চিমে তার আরও কাজ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না।
‘আ মাইটি হার্ট’ ছিল ইরফানের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কাজ। তার প্রথম আন্তর্জাতিক সিনেমা মীরা নায়ারের ‘দ্য নেমসেক’ (২০০৬)। হলিউড স্টুডিওর অর্থায়নে নির্মিত ভারতীয়-আমেরিকান অভিবাসীদের জীবনধর্মী এই সিনেমাটি তখনো নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরের সিনেমা হলে চলছিল।
অসীম ইরফানকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই বড় কিছু হচ্ছে।’ কারণ বলিউডের আর কোনো অভিনেতার কথা তার জানা ছিল না, যার দুটি ছবি একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হচ্ছিল।
সে বছরের শেষের দিকে ইরফান আবারও আন্তর্জাতিক পর্দায় ফেরেন। ওয়েস অ্যান্ডারসনের ‘দ্য দার্জিলিং লিমিটেড’ সিনেমায় ছোট একটি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন।
মঞ্চ অভিনয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল ভারতের স্বনামধন্য ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনএসডি), অথচ অভিনেতা হিসেবে ইরফানের শুরুর পথচলাটা ছিল টেলিভিশনে টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প।
তার জীবনের প্রথম বড় সাফল্য আসে ২০০১ সালে, ব্রিটিশ-ভারতীয় নির্মাতা আসিফ কাপাডিয়ার ‘দ্য ওয়ারিয়র’ সিনেমার মাধ্যমে। বাফটাজয়ী এই সিনেমা যখন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল, তখন এর সঙ্গে ছিল প্রয়াত নির্মাতা অ্যান্থনি মিনহেলার বিশেষ প্রশংসাপত্র।
২০০৭ সালের মধ্যেই ইরফান বলিউডের একজন প্রতিষ্ঠিত তারকা হয়ে ওঠেন। ভারতের বাইরে কাজ করার খুব একটা বৈষয়িক প্রয়োজন ছিল না তার। তবে একজন প্রকৃত অভিনেতা হিসেবে সব সময় নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে চাইতেন।
পরের বছরই তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সাফল্যটি আসে ড্যানি বয়েলের ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ সিনেমার মাধ্যমে। সিনেমাটি ফ্রিদা পিন্টো ও দেব প্যাটেলকে রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেলেও এটি পর্দার আড়ালে ইরফানের জন্যও বৈশ্বিক মঞ্চের পথ প্রশস্ত করেছিল।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রে পেশাদার এজেন্ট ও ম্যানেজার নিয়োগের মাধ্যমে শুরু হয় তার নতুন যাত্রা। পরে আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নাম লেখান হলিউডের বড় বাজেটের সব সিনেমায়।
২০১২ সালের ‘দ্য অ্যামেজিং স্পাইডার-ম্যান’ সিনেমায় ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করলেও ২০১৬ সালের ‘ইনফার্নো’ এবং ২০১৫ সালের ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’ সিনেমার মতো বড় প্রজেক্টের সব সিনেমায় তিনি কাজ করেন।
‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’ সিনেমার প্রচারণায় ইরফান সংবাদমাধ্যমকে একটি গল্প শুনিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে যখন প্রথম ‘জুরাসিক পার্ক’ মুক্তি পায়, তখন তিনি মুম্বাইয়ে (তৎকালীন বম্বে) টেলিভিশন অভিনেতা হিসেবে টিকে থাকার লড়াই করছেন। সে সময় সিনেমাটি দেখতে একটি টিকিট কেনার সামর্থ্যও তার ছিল না।
ঠিক ২২ বছর পর তিনি সেই ফ্র্যাঞ্চাইজিরই একটি সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন, যা বিশ্বজুড়ে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। রাতারাতি তিনি হয়ে ওঠেন হলিউডের পর্দায় ভারতের সফলতম অভিনেতা।
২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘লাইফ অব পাই’ সিনেমার মতো বড় সব আন্তর্জাতিক প্রজেক্টের সুযোগ এলেও ইরফানকে প্রায়ই কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হতো। পশ্চিমের বড় প্রজেক্টে কাজ করবেন, নাকি দেশের মাটিতে ছোট কিন্তু শৈল্পিক কাজগুলোতে মনোনিবেশ করবেন, এমন দোটানায় প্রায়ই পড়তে হতো তাকে।
এমন পরিস্থিতিতে তাকে বেশ কয়েকবার পড়তে হয়েছে।
২০১৫ সালে তিনি রিডলি স্কটের ‘দ্য মার্শিয়ান’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তার বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন দিল্লি ও কলকাতা প্রেক্ষাপটে নির্মিত এক চমৎকার প্রেমের গল্প ‘পিকু’।
ইরফানের জীবনী নিয়ে কাজ করার সময় ‘পিকু’র পরিচালক সুজিত সরকার অসীম ছাবরাকে বলেছিলেন, তিনি কী করবেন তা নিয়ে বেশ দোটানায় ছিলেন, বারবার তাকেই জিজ্ঞেস করছিলেন।
এর আগে ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া রিডলি স্কটের ‘বডি অব লাইজ’ সিনেমাতেও অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ইরফান। তবে তার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ছিল ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’ (২০১৪) হাতছাড়া হওয়া নিয়ে। কারণ একই সময়ে ভারতে তার অভিনীত ‘দ্য লাঞ্চবক্স’ সিনেমার শুটিং চলছিল।
বিশেষ করে ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ এর পর ইরফান যে উচ্চতার তারকা হয়ে উঠেছিলেন, এটি তারই প্রমাণ। তিনি অনায়াসেই হলিউডের ‘এ-লিস্ট’ বা শীর্ষ সারির সিনেমাগুলোর পথে হাঁটতে পারতেন।
কিন্তু ২০১৮ সালে অভিনয় করেন তার প্রথম আমেরিকান স্বতন্ত্র ঘরানার ‘পাজল’ সিনেমায়। মিষ্টি গল্পের এই সিনেমায় কেলি ম্যাকডোনাল্ডের বিপরীতে তিনি খামখেয়ালি ধনী ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করেন।
৫৩ বছর বয়সী ইরফানের সামনে বিশ্ব চলচ্চিত্রের দুয়ার যখন সবে পুরোপুরি খুলতে শুরু করেছে, তখনই এলো সেই দুঃসংবাদ। ২০১৮ সালে তিনি জানান, তিনি ‘নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমার’ এ আক্রান্ত। পরে চিকিৎসার জন্য দ্রুতই লন্ডনে পাড়ি জমান।
ক্যানসারের সঙ্গে দুই বছরের লড়াই ও চিকিৎসার মাঝেই নিজের শেষ হিন্দি সিনেমা ‘আংরেজি মিডিয়াম’ এর কাজ শেষ করতে পেরেছিলেন। এই সিনেমা ২০২০ সালের ১৩ মার্চ মুক্তি পেয়েছিল।
ইরফান কেবল একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিল্পসত্ত্বা। ছোট পর্দা থেকে শুরু করে বলিউড, তারপর হলিউড, প্রতিটি ধাপে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করে গেছেন। বড় বাজেটের ঝলকানির চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল গল্প, চরিত্র ও অভিনয়। তাই তার সাফল্য কেবল বক্সঅফিসে সীমাবদ্ধ ছিল না, ছুঁয়ে গেছে দর্শকের হৃদয়ও।