পর্দার ‘সরকার’, সিনেমার গল্পই বাস্তব হলো বিজয়ের জীবনে

আট বছরের ব্যবধানে সিনেমার সেই চিত্রনাট্য বাস্তব হয়ে ফিরে এলো
রবিউল কমল
রবিউল কমল

সালটা ছিল ২০১৮। তখন মুক্তি পেয়েছিল থালাপতি বিজয়ের সিনেমা ‘সরকার’। সেই সিনেমাতে বিজয়কে রাজনৈতিক চরিত্রে দেখা যায়। তিনি তামিলনাড়ুর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে জিতে যান। 

আর এখন ২০৬৬ সাল। আট বছরের ব্যবধানে সিনেমার সেই ঘটনাই চিত্রনাট্য ছাড়া বাস্তব হয়ে ফিরে এলো।

সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ২০১৮ সালের নভেম্বর। সেখানে তিনি ‘সুন্দর রামাস্বামী’ চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রে তাকে একজন সফল প্রবাসী ব্যবসায়ী হিসেবে দেখা যায়। পর্দায় বিজয় কেবল তার ভোট দিতেই ভারতে ফিরেছিলেন।

কিন্তু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে জানতে পারেন, তার ভোট আরেকজন দিয়ে দিয়েছে। এরপর শুরু হয় প্রায় দুই ঘণ্টার গল্প। যেখানে নির্বাচনী জালিয়াতি, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেন। তিনি ভোটারদের কেবল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা ভেঙে দেন।

থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত
থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত

সিনেমার শেষে সুন্দর রামাস্বামী কেবল নিজের ভোটের জন্য লড়েননি। বরং নিজে নির্বাচনে দাঁড়ান, পেশাদার রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জিতেও যান।

তবে সিনেমার সেই গল্প ছিল চিত্রনাট্য, দর্শকপ্রিয়, নায়ককেন্দ্রিক একটি ‘ম্যাস ফ্যান্টাসি’।

আট বছর পর, বিজয় বাস্তব রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন। একজন অভিনেতা হিসেবে তার জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেন।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘোষণা দেন, সিনেমা ছেড়ে তামিলাগা ভেট্ট্রি কাজাগাম (টিভিকে) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করছেন।

তার পেছনে কোনো বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছিল না, কোনো রাজনৈতিক পারিবারিক পরিচয় ছিল না, এমনকি বহু বছর ধরে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা ডিএমকে বা এআইএডিএমকের সঙ্গেও কোনো জোট ছিল না।

থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত
থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত

দল গঠনের পর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত দুই বছরে টিভিকে যা কিছু করেছে, তার সব চমকপ্রদ না হলেও বাস্তবভিত্তিক ছিল। ২৩৪টি আসন জুড়ে বুথভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলা, ২০২৪ সালের অক্টোবরে বিক্রাভান্ডিতে বিশাল জনসমাগমে দলীয় সম্মেলন করা, এবং এমন একটি ইশতেহার তৈরি করা। তার ইশতেহার ছিল অবহেলিত মানুষের জন্য। বিজয়ের লক্ষ্য ছিল নারী, শিক্ষার্থী, নতুন ভোটার ও দিনমজুররা।

গতকাল যখন ভোট গণনা শুরু হয়, টিভিকে শতাধিক আসনে এগিয়ে ছিল। পিছিয়ে ছিল ২০২১ সালে প্রবল দাপটে ক্ষমতায় আসা ডিএমকে। আর এআইএডিএমকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছিল। এখানে উল্লেখ্য, এআইএডিএমকে আট বছর আগে সরকার সিনেমা আটকানোর চেষ্টা করেছিল।

সিনেমাটি মুক্তির পর ২০১৯ সালে ইলেকশন কমিশন অব ইন্ডিয়া একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। তারা এই সিনেমার মূল ধারণাটি ব্যবহার করে সচেতনতা তৈরি করে। কমিশন প্রচারণায় বলেছিল, যদি কারও নামে জাল ভোট দেওয়া হয়, তবে তিনি আইনগতভাবে ব্যবস্থান নিতে পারবেন।

থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত
থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত

সিনেমায় বিজয়ের চরিত্র সুন্দর রামাস্বামী ২০১৮ সালে তামিলনাড়ুর মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে একটি আহ্বান জানিয়েছিলেন, আপনারা ভোট দিতে যান। আপনার অধিকার আদায় করে নিন। আপনার অনুপস্থিতির কারণে কেউ যেন এটার অপব্যবহার না করে।

তামিলনাড়ুর মানুষ তখন সিনেমাটি দেখেছিল, হাততালি দিয়েছিল।

সিনেমাটি মুক্তির আট বছর পর তামিলনাড়ু নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৫ দশমিক ১ শতাংশ, যা একটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সর্বোচ্চ। রাজ্যটির ৩৮ জেলার মধ্যে ৩২টিতে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। কিছু আসনে এই হার ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিল।

থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত
থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত

অবাক করা ব্যাপার হলো, ভোটকেন্দ্র খোলার আগেই মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি সবার নজর কাড়ে। পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো, যেখানে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বেশি আলোচনা হয় না, সেখানেও ভোটার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

যে মানুষটি একসময় পর্দায় ভোটারদের ভোট দিতে উৎসাহিত করেছিলেন, এবার তিনিই ছিলেন ব্যালটে।

বিজয়ের দুই বছরের প্রচারণা ভোটার উপস্থিতির কারণ কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে এটিকে অস্বীকার করা কঠিন, তামিলনাড়ুর ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি হয়েছে সেই নির্বাচনে, যেখানে তিনি প্রার্থী ছিলেন।

সিনেমায় যেভাবে শেষ করেছিলেন আট বছর পর বাস্তবে সেখান থেকে আবার শুরু করলেন থালাপতি বিজয়। তবে এবার কোনো সিনেমার মতো ক্রেডিট নেই, কোনো ইন্টারভাল নেই, আর নিশ্চিত কোনো দ্বিতীয় অর্ধও নেই।

তবে সিনেমার গল্প আর বাস্তবতা এক নয়। এখন দেখার বিষয় যে রাজ্যের মানুষ বিজয়কে এই ক্ষমতা দিয়েছে, তিনি সেই ক্ষমতার ব্যবহার করবনে।

থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত
থালাপতি বিজয়। ছবি: সংগৃহীত