টানা বৃষ্টিতে ডুবছে উত্তরের ৫ জেলার ধান-ভুট্টা, অকাল বন্যার শঙ্কা

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

টানা পাঁচ দিনের বর্ষণে রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। পানির নিচে ডুবে আছে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকার পাকা বোরো ধান ও ভুট্টার খেত। 

ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলাসহ উত্তরের অন্তত ২৬টি নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। তবে এখনো কোনো নদীর পানি বিপৎসীমায় পৌঁছায়নি।

গত শনিবার দুপুর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরছে। ভারী বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। পেকে যাওয়া ধান ও কাটার উপযোগী ভুট্টাও পানির নিচে চলে গেছে। যারা ফসল তুলেছেন তারাও রোদের অভাবে ঘরের ফসল শুকাতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

রংপুর আবহাওয়া কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, শনিবার থেকে প্রতিদিন বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। আকাশ প্রায় সারাক্ষণ মেঘলা থাকছে। কখনো টানা বর্ষণ, আবার কখনো থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন থাকতে পারে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, বৃষ্টির কারণে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলাসহ সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। তবে এখনো পানি বিপৎসীমার অনেক নিচে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এবং উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামলে আকস্মিক বন্যা হতে পারে। নদীর চরে এর মধ্যেই ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।’

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শায়খুল আরিফিন বলেন, নিম্নাঞ্চলের বোরো ধান ও ভুট্টার খেতে পানি জমেছে। কৃষকেরা অনেক জায়গায় ফসল কাটতে পারছেন না। রোদ না থাকায় ধান-ভুট্টা শুকানো যাচ্ছে না। এতেও ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে।

ধান খেত
ছবি: এস দীলিপ রায়

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর গ্রামের কৃষক নজর আলী (৬৫) জানান, তিনি আট বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। সব ধান পেকে গেছে। এখন খেতে পানি জমে থাকায় বেশি মজুরিতে শ্রমিক এনে ধান কাটছেন। তিনি বলেন, ‘পানির মধ্যে ধান কাটতে দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে। না কাটলে খেতেই নষ্ট হয়ে যাবে।’

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার চর বজরা এলাকার কৃষক আবদুস সামাদ (৭০) বলেন, তার ছয় বিঘা জমির ধান ও ১০ বিঘা জমির ভুট্টা পানির নিচে চলে গেছে। দ্রুত কাটতে না পারলে ক্ষতি হবে, কিন্তু শ্রমিক খরচ বেশি হওয়ায় এখনো ফসল খেতে পড়ে আছে। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি থাকলে কাটলেও শুকাতে পারব না। তাই কী করব বুঝতে পারছি না।’

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর এলাকার কৃষক শামসুল আলম (৫৫) বলেন, চার বিঘা জমির ভুট্টা ও তিন বিঘা জমির ধান কেটে বাড়িতে তুলেছেন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে মাড়াই করতে পারছেন না। উঠানে ফসল স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কয়েক দিন এভাবে থাকলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার চর গড্ডিমারী এলাকার কৃষক আফতাব উদ্দিন (৬০) বলেন, তিস্তার পানি দ্রুত বাড়ছে। চরের জমিতে পানি উঠে যাওয়ায় তড়িঘড়ি করে ধান ও ভুট্টা কেটে বাড়িতে নিতে হচ্ছে। অনেক জমি এরই মধ্যে তলিয়ে গেছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চর যাত্রাপুর এলাকার কৃষক খাদিমুল ইসলাম (৫০) বলেন, সোমবার যে চর শুকনো ছিল, বুধবার সকালে সেখানে পানি উঠে গেছে। তিনি বলেন, ‘এখনো অনেক ধান পাকেনি। সামনে যদি আরও পানি বাড়ে, তাহলে বড় ক্ষতি হবে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান এবং ১ লাখ ২৭ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। বর্তমানে ভুট্টা কাটার কাজ পুরোদমে চলছে এবং নিম্নাঞ্চলের জমিতে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে।