ঘের বাঁচাতে বেআইনিভাবে স্লুইসগেট বন্ধ রাখায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে বন্যা দীর্ঘায়িত

মোকাম্মেল শুভ
মোকাম্মেল শুভ

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এখনো প্লাবিত হয়ে আছে। তবে চলমান বন্যা পরিস্থিতির অবনতির জন্য শুধু বৃষ্টিপাত নয়, কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতাকেই দায়ী করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রাথমিকভাবে মাছ ও লবণের ঘের রক্ষায় স্লুইসগেট বন্ধ করে দেওয়াকেই দায়ী করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এছাড়া, অবৈধভাবে নির্মিত কিছু বাঁধের কারণে বন্যার পানি নিষ্কাশনে ধীরগতির কথাও বলছেন তারা।

চট্টগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফ আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, পুরো অঞ্চলের স্লুইসগেটগুলো খুলে দেওয়া হলেও পরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা কিছু গেট আবার বন্ধ করে দিচ্ছে।

স্লুইসগেট
আটকে দেওয়া স্লুইসগেট। ছবি: সংগৃহীত

কর্মকর্তারা আরও জানান, ঘের বাঁচাতে স্থানীয়রা অবৈধভাবে কিছু বাঁধ তৈরি করেছেন। এ কারণে বন্যার পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকছে এবং এতে এ অঞ্চলের লাখো বাসিন্দা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যেন জোয়ারের সময় লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছিল।

স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, জোয়ারের সময় এই গেটগুলো বন্ধ রাখা হয় যেন সমুদ্রের পানি ভেতরে ঢুকতে না পারে। আর ভাটার সময় গেটগুলো খুলে দেওয়া হয়, যেন উজানের বন্যার পানি ও বৃষ্টির পানি নদী হয়ে সাগরে চলে যেতে পারে।

দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের পাহাড়ি ঢল সাধারণত সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী দিয়ে মহেশখালী চ্যানেলের মধ্য হয়ে সাগরে চলে যায়।

এছাড়া, অসংখ্য সংযোগ খালও বন্যার পানি নিষ্কাশনে সহায়তা করে।

কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী নদী-খালের স্লুইসগেট বন্ধ করে, খাল দখল করে এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে এই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে নষ্ট করে দিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

সম্প্রতি, চকরিয়া উপজেলায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক এবং মাতামুহুরী উপজেলার বাসিন্দা সাংবাদিক আলাউদ্দিন আলো বদরখালীর ডেমশিয়া এলাকায় পাঁচ কপাটের একটি স্লুইসগেট পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি দেখতে পান, স্থানীয়রা কাঠের তক্তা দিয়ে মাত্র চার ফুট অংশ খোলা রেখে পুরো গেটটি আটকে রেখেছে।

বন্যা
বন্যায় বিপর্যস্ত মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের চেষ্টায়। ছবি: সংগৃহীত

আলাউদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সেখানে আগে থেকেই মাছ ধরার জাল পাতা হয়েছিল। পানির স্রোতের গতি কমাতে স্থানীয়রা সরু পথ রেখেছে। বদরখালীর ওই স্থানে ৩ ঘণ্টায় প্রায় ৯ লাখ টাকার মাছ ধরা হয়েছে বলে খবর পেয়েছি।'

বিষয়টি নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফকে জানানো হলে তিনি জানান, বিষয়গুলো সম্পর্কে তারা অবগত আছেন। 'স্লুইসগেট আটকে দেওয়ায় বন্যার পানি নামতে পারছে না। মাছ চাষের জন্য খালের ওপর নির্মিত অবৈধ বাঁধের কারণে বন্যার পানি অনেকক্ষেত্রে স্লুইসগেট পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারছে না,' বলেন তিনি।

পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে গত কয়েকদিন ধরে স্থানীয় প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তারা এসব বাঁধ কেটে দিচ্ছেন বলে জানান তিনি।

জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, 'উপকূলীয় এলাকায় সাধারণত দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার কথা নয়। কিন্তু স্লুইসগেট বেআইনিভাবে বন্ধ রাখায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নতুন করে যেন এমন কাজ না হয় সেজন্য প্রশাসন নিয়মিতভাবে স্লুইসগেটগুলো পর্যবেক্ষণ করছে।'

এ বিষয়ে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও শাহিন দেলোয়ার ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বেআইনিভাবে স্লুইসগেট বন্ধ রাখার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। পুলিশ চলে যাওয়ার পর কিছু গেট আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্থানীয় কিছু লোকজন অপারেটরদের দিয়ে নিজেদের স্বার্থে এসব বেআইনি কাজ করছে।'