বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে ভ্যাকসিন কেন প্রথম শর্ত?
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষায় প্রতি বছরই পাড়ি জমান বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী। তবে ভিসা, অ্যাডমিশন, ফান্ডিং—এসবের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই অবহেলিত বিষয় হলো প্রয়োজনীয় টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণ। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু টিকা বাধ্যতামূলক করে থাকে, যার মূল কারণ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা।
এই টিকাগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে এমএমআর (হাম, মাম্পস ও রুবেলা ভাইরাস) টিকা। এই তিনটি রোগই অত্যন্ত সংক্রামক। বিশেষ করে হাম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও কিছু অঞ্চলে দেখা গেছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে দুই ডোজ এমএমআর টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করে থাকে। দ্বিতীয়ত, টিটেনাস, ডিফথেরিয়া ও পার্টুসিসের টিকা। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন গুরুতর রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গত ১০ বছরের মধ্যে নেওয়া একটি টিড্যাপ বুস্টার ডোজের রিপোর্ট চেয়ে থাকে।
ভ্যারিসেলা বা চিকেনপক্স টিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব শিক্ষার্থী আগে এই রোগে আক্রান্ত হয়নি বা টিকা নেয়নি, তাদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক। কারণ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে চিকেনপক্স জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
এরপর আসে মেনিনগোকক্কাল টিকা, যা বিশেষভাবে ডরমিটরিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই রোগটি সাধারণত মস্তিষ্ক এবং স্পাইনাল কর্ডে সংক্রমণ ঘটায়, যা দ্রুত প্রাণঘাতীর কারণ হতে পারে। আর ডর্মগুলো যেহেতু কিছুটা ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে থাকে, তাই এর ঝুঁকিও বেশি থাকে। এছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) টিকাও নিতে উৎসাহিত করে, বিশেষ করে শীতকালে।
বিভিন্ন ভ্যাকসিনের পেছনের কারণ
এই টিকাগুলোর পেছনের মূল কারণ হলো ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করা। যখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী টিকা নেয়, তখন সংক্রামক রোগের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে পুরো ক্যাম্পাস, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী সবাই নিরাপদ থাকে।
বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব টিকার সঠিক ডকুমেন্টেশন সংরক্ষণ করা এবং সেটি সঠিক সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করা। শুধু টিকা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। কেননা তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেখাতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কিংবা কোর্স রেজিস্ট্রেশনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়াটি গুরুত্ব সহকারে নেওয়া জরুরি।
আবার আমরা যারা নব্বই দশকের—এমন অনেক শিক্ষার্থীর টিকার তথ্য বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকে। যেমন: স্কুলের স্বাস্থ্য রেকর্ড, শিশু বয়সের টিকাদান কার্ড কিংবা ব্যক্তিগত ডাক্তারের কাছে। এসব তথ্য একত্রিত করে একটি সুসংগঠিত ফরম্যাটে প্রস্তুত করতে হবে। বিশেষ করে টিকার নাম, ডোজের সংখ্যা এবং গ্রহণের নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এই তথ্যগুলো নির্ভুলভাবে যাচাই করে।
তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা এই টিকাগুলো নতুন করেই নিয়ে থাকে। পরবর্তীতে চাইলে, আপনি ডিজিটাল কপি স্ক্যান করে পিডিএফ আকারে দ্রুত আপলোড বা ইমেইল করতে পারবেন। অনেক সময় এই একই ডকুমেন্টেশন একাধিক জায়গায় জমা দিতে হয়—বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ সেন্টার, হোস্টেল কর্তৃপক্ষ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যবীমা সংক্রান্ত কাজে।
সবশেষে, যদি কোনো টিকার প্রমাণ পাওয়া না যায়, তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় টিকা নেওয়া বা অ্যান্টিবডি টেস্টের পরামর্শ দেয়। তাই দেরি না করে আগেভাগেই ডকুমেন্টগুলো গুছিয়ে রাখতে পারলে তা শিক্ষার্থীদের জন্য ঝামেলা কমাবে।
তাই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতির তালিকায় ভ্যাকসিনকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেমন: আপনি আপনার একাডেমিক ডকুমেন্ট, আর্থিক প্রস্তুতি কিংবা ভিসা প্রক্রিয়া নিয়ে যেমন গুরুত্ব দেন, ঠিক তেমনভাবেই স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাই আগে থেকেই জেনে নিন প্রয়োজনীয় কোন টিকাগুলো আপনাকে নিতে হবে। আবার নির্দিষ্ট একটি ডোজের পরবর্তী ডোজের ক্ষেত্রে কিছু সময়সীমা থাকে। তাই প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সময়ের মধ্যেই শুরু করুন।

