ডুবে যাওয়া ঢাকায় বিপর্যস্ত জীবন, দেখুন ছবিতে
রাতভর টানা বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে স্বাভাবিক নগরজীবন। প্রধান সড়ক থেকে আবাসিক এলাকা—সবখানেই দেখা গেছে জলাবদ্ধতার চিত্র। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আজ রোববার রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
স্বল্প সময়ের এই ভারী বৃষ্টিতে নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা সামাল দিতে না পারায় সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা।
পানির নিচে ব্যস্ত সড়ক
গ্রিন রোড, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর সড়ক, মোহাম্মদপুর এবং কালশীসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পানি জমে যায়।
ড্রেন উপচে সড়কে জমে থাকা পানিতে আটকে পড়ে যানবাহন। অনেক জায়গায় রিকশা, সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি ধীরগতিতে চলতে বাধ্য হয়। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।
হাঁটুপানি পেরিয়ে গন্তব্যে মানুষ
জলাবদ্ধতার কারণে অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কেউ হেঁটে, কেউ রিকশায়, আবার কেউ থেমে থাকা বাস থেকে নেমে পানির মধ্য দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
পানিতে তলিয়ে যায় ফুটপাতও। ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীদের ব্যস্ত সড়কের ওপর দিয়েই চলাচল করতে হয়।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘গাড়ি চলাচলের সময় পানির ঢেউ তৈরি হচ্ছে, এতে হাঁটা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। ফুটপাত পানির নিচে থাকায় আমাদের রাস্তায় হাঁটতে হচ্ছে।’
মিরপুরে দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি
রাজধানীর মিরপুর এলাকার শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মনিপুরে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক এলাকায় পানি হাঁটুর ওপর উঠে যায়। ফলে অনেক পরিবার ঘর থেকে বের হতে পারেনি।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কারণে মনিপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্ধারিত অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা পিছিয়ে দিতে হয়।
কাজীপাড়ার বাসিন্দা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘সন্তানকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে বের হয়েছিলাম। কিন্তু গলির বাইরে বের হতে পারিনি। পানি হাঁটুর ওপরে ছিল।’
ছাতা থাকলেও রক্ষা নেই
বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ছাতা ব্যবহার করলেও জমে থাকা পানির কারণে পথচারীদের জুতা ও পোশাক ভিজে যায়। যানবাহনের চাকার পানির ছিটায় দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
ধানমন্ডি ২৭ এলাকার বাসিন্দা সাবরিনা ইসলাম জানান, ছাতা নিয়ে বের হলেও কর্মস্থলে পৌঁছানোর পর তার পোশাক ও জুতা পুরোপুরি ভিজে যায়।
বারবার একই সংকট, ক্ষুব্ধ নগরবাসী
প্রতি বর্ষায় একই ধরনের জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ রুবেল হোসেন বলেন, ‘কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে সকাল থেকেই রাস্তায় হাঁটুপানি জমে থাকে।’
রাজধানীর বাইরে বন্যায় বিপর্যয়
ঢাকার জলাবদ্ধতার পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে চট্টগ্রাম বিভাগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যায় অন্তত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিসহ সাত জেলার বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ
বন্যায় কয়েকশ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অনেক এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা।
দুর্গত মানুষদের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে ১ হাজার ৭০০টির বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অনেক পরিবার এখনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুতের সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
বন্যাকবলিত দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যরা নৌযানে করে কাজ করছেন।
বাড়ছে নতুন ঝুঁকি
বন্যার পানি এখন উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, কুশিয়ারা, মনু ও খোয়াইসহ কয়েকটি নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
বর্ষার বৃষ্টি না কমা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
