‘জানি না কখন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায় মধুমতি'
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের দিগনগর গ্রামের কৃষক মো. তোতা মিয়ার ৬৫ শতাংশ জমিতে বসতভিটা ছিল। একটি সেমিপাকা ঘর, সঙ্গে রান্নাঘর ও গোয়াল ঘরও ছিল। বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় আড়াইশ গাছপালায় ঘেরা ছিল তার বাড়িটি। মধুমতি নদীর ভাঙনে গত দুই মাসে তার এই বসতভিটার ৬০ শতাংশই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন টিকে আছে মাত্র পাঁচ শতাংশ জমি। বাধ্য হয়ে ঘর ভেঙে অন্যত্র নিয়ে গেছেন তোতা মিয়া। সেখানে টিনের ঘর তুলে বসবাস করছেন তিনি।
তোতা মিয়ার মতো এ বছর মধুমতি নদীর ভাঙনে আলফাডাঙ্গার বুড়াইচ ইউনিয়নের চরখোলাবাড়িয়া এবং গোপালপুর ইউনিয়নের দিগনগর গ্রামের কমপক্ষে ১১০টি বসতভিটা বিলীন হয়ে গেছে।
এর মধ্যে চরখোলাবাড়িয়া গ্রামে ৬০টি বসতভিটা এবং দিগনগর গ্রামে বিলীন হয়েছে কমপক্ষে ৫০টি বসতভিটা।
নদী এখন দুটি গ্রামের স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, পোস্ট অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি চলে এসেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে দুই গ্রামের আরও প্রায় সাড়ে পাঁচশ ঘরবাড়ি।
বুড়াইচ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব ওরফে পান্নু মিয়া এবং গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল খান দ্য ডেইলি স্টারকে ভাঙনের এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তারা জানান, শুধু বসতভিটাই নয়, ভাঙনে দুই গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পুরাতন দিগনগর খেয়াঘাট থেকে চরমাকরাইল পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ ইটের রাস্তার প্রায় দুই কিলোমিটার ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে।
সরেজমিনে দুই গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অনেকেই নদীর পাড় থেকে গাছ কেটে সরিয়ে নিচ্ছেন। একমাত্র ইটের রাস্তার বিলীন হওয়ার চিহ্নও স্পষ্ট।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত ২০ জুলাই থেকে ওই দুই এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। কখনো ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে, আবার কখনো কিছুটা কমছে। তবে এখনো পুরোপুরি থামেনি।
চরখোলাবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ ইতি বেগম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ভাঙন শুরু হওয়ার আগে আমাদের বাড়ি থেকে দুইশ ফুট দূরে ছিল নদী। ভাঙতে ভাঙতে এখন বাড়িঘর সব নিয়ে গেছে। জিনিসপত্র রাস্তার ওপর রেখে দিয়েছি। কোথায় যাব, কিছুই জানি না।’
একই গ্রামের আরেক গৃহবধূ মহিমুন্নেছা বলেন, ‘আমাদের বাড়ি গত বছরই নদীতে নিয়ে গেছে। এরপর বছরে পাঁচ হাজার টাকা চুক্তিতে অন্যের জমিতে ঘর তুলে বসবাস শুরু করি। এ বছর নদী আবার ভাঙতে ভাঙতে কাছে চলে এসেছে। জানি না কখন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায় নদী।’
বসতভিটার পাশাপাশি গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হুমকির মুখে রয়েছে।
চরখোলাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে একটি সেমিপাকা ভবন রয়েছে। ৭৫ জন শিক্ষার্থী এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। নদী এখন বিদ্যালয়ের সীমানা থেকে প্রায় দুইশ গজের মধ্যে চলে এসেছে।’
একই গ্রামের বাসিন্দা হাবিব মোল্লা বলেন, ‘গ্রামের মাদ্রাসা, পোস্ট অফিস ও এতিমখানা থেকে মাত্র একশ গজ দূরে এখন নদী। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে মিয়াপাড়া জামে মসজিদও।’
বুড়াইচের ইউপি চেয়ারম্যান পান্নু মিয়া বলেন, ‘গ্রামের কোনো না কোনো অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। স্থায়ীভাবে নদীর তীর রক্ষা করা না গেলে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হবে না।’
দিগনগর গ্রামের পরিস্থিতিও অনেকটা একই রকম।
এ গ্রামের বাসিন্দা মো. জামিরুল শেখ বলেন, ‘ভাঙনের কারণে রাতে আমাদের ঘুম হয় না। যেভাবে নদী ভাঙছে, এভাবে চলতে থাকলে আমাদের গ্রামও বিলীন হতে দেরি নেই।’
গ্রামের আরেক বাসিন্দা মো. ইমরুল বলেন, ‘নদী এখন মসজিদ ও গোরস্থান থেকে প্রায় দেড়শ গজ দূরে রয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে দিগনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও।
এ বিষয়ে গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল খানও জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের ওপর জোর দেন।
ভাঙনের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন।
তিনি বলেন, ‘আলফাডাঙ্গা ও গোপালগঞ্জ জেলার প্রায় ১৫ কিলোমিটার নদী রক্ষার কাজ ইতোমধ্যে জরিপ করেছি আমরা।’
এই কাজ করতে পারলে ভাঙ্গন স্থায়ীভাবে ঠেকানো যাবে বলে মনে করেন তিনি। একইসঙ্গে নদীর পানি কমলে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পাউবোর এই কর্মকর্তা।