এই বর্ষায় ২ কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে
জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বয়ে গেলেও পূর্বাভাস বলছে, এবারের বর্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় গড় বৃষ্টিপাত কম হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব দেখা যেতে পারে মধ্যাঞ্চলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপরীত চিত্রও দেখা যাবে। অর্থাৎ, কোনো এলাকা থাকবে প্রায় বৃষ্টিশূন্য, আবার কোথাও থাকবে ভারী বৃষ্টি।
দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় স্বাভাবিক তুলনায় বেশি বৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছে সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট আউটলুক ফোরাম।
বৃষ্টি কম হওয়ায় গড় তাপমাত্রাও থাকবে তুলনামূলক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, মৌসুমি বৃষ্টির কমে গেলে কৃষি সেচ ব্যাহত হতে পারে। কমে যেতে পারে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন। পাশাপাশি তাপপ্রবাহের সময় কমে যেতে পারে শ্রমজীবী মানুষের আয়। এছাড়া, তীব্র গরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। এগুলো মোকাবিলা করতে দক্ষিণ এশিয়ার নীতি-নির্ধারকদের পরিকল্পনা প্রস্তুত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
কম বৃষ্টির পেছনে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা দুটি বড় কারণ শনাক্ত করেছে—এর একটি ‘এল নিনো’, অপরটি ‘আইওডি’।
চলতি বছরের ২৫ থেকে ৩০ এপ্রিল মালদ্বীপের মালেতে সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট আউটলুক ফোরামের (এসএএসসিওএফ) ৩৪তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার নয়টি জাতীয় আবহাওয়া ও জলবিদ্যা সংস্থা অংশ নেয়। দেশগুলো হলো—আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা।
সেখানে বিশেষজ্ঞরা একমত হন—এবারের বর্ষায় ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি গড়ে উঠতে পারে। একইসঙ্গে এই অঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (আইওডি) নিরপেক্ষ অবস্থা থেকে ইতিবাচক হতে পারে।
যদিও সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাসের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।
শ্রীলঙ্কা ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ছাড়া এই অঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টির ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশই জুন থেকে সেপ্টেম্বরে হয়ে থাকে। নদী-খাল-বিল পানিতে পূর্ণ হয়। এখান থেকে একটি বড় অংশ কৃষি সেচ, খাবার ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হয়।
এর বাইরে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, সেটিও এই সময় পূর্ণ হয়।
‘এল নিনো’ কী?
‘এল নিনো’ হলো সাউদার্ন অসকিলেশন (ইএনএসও) নামে আবহাওয়ার একটি ধরন। ‘এল নিনো’ বলতে ইএনএসওর উষ্ণায়ন পর্যায়কে বোঝায়। অন্যদিকে, ‘লা নিনা’ বোঝায় এর শীতলকরণ পর্যায়কে। এল নিনো দেখা দিলে সে বছর অস্ট্রেলিয়ার দিকে অয়ন বায়ুপ্রবাহ একেবারেই কমে যায়। এটি অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্রের গরম পানির প্রবাহ অস্ট্রেলিয়ার দিকে যেতে বাধা দেয় এবং এই উপকূলের উচ্চ স্রোতকে ঠেলে পেরুর দিকে পাঠিয়ে দেয়। এতে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও পানির স্তর বৃদ্ধি পায়। ফলে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা বাতাস হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। এ কারণে ভারী বৃষ্টিপাত দেখা যায়।
বিজ্ঞানীরা এখনো বোঝার চেষ্টা করছেন যে, এল নিনো কেন ঘটে কিংবা কখন ঘটে। এল নিনোর বছরগুলোয় তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়। লা নিনার সময়ে প্রায় একই পরিমাণে হ্রাস পায়।
এই দুটির মধ্যে যে পর্যায়, তাকে ‘নিরপেক্ষ’ বলা হয়।
আইওডি কী?
ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (আইওডি) হলো প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত একটি জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, যা সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল উভয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। ভারত মহাসাগরের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রার ওঠানামাই আইওডির বৈশিষ্ট্য। এটি বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরনকেও প্রভাবিত করে, বিশেষ করে ভারত মহাসাগর সংলগ্ন অঞ্চলগুলোয়—যার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশ রয়েছে।
আইওডির দুটি পর্যায় রয়েছে—একটি ‘ইতিবাচক’ এবং অন্যটি ‘নেতিবাচক’ ধাপ।
‘ইতিবাচক’ পর্যায়ে নিরক্ষরেখা বরাবর নিম্নস্তরের বাতাস পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। এই বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের ফলে উষ্ণ পানি ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশে সরে যায়। উষ্ণ পানি পশ্চিমে সরে যাওয়ার সময় পূর্বাংশে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা পানি উপরে উঠে আসে। ফলে ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশ উষ্ণ ও আর্দ্র হয়ে ওঠে। যার কারণে পূর্ব আফ্রিকা, আরব উপদ্বীপ ও এর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোয় বেশি বৃষ্টি হয়।
আইওডির ‘নেতিবাচক’ পর্যায়ে এই পরিস্থিতি উল্টো হয়ে যায়। তখন ভারত মহাসাগরের পূর্বাংশ উষ্ণ ও আর্দ্র হয়ে ওঠে, ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বেশি বৃষ্টি হয়। আর পশ্চিমাংশ ঠান্ডা ও শুষ্ক হয়ে যায়। যে কারণে পূর্ব আফ্রিকা, আরব উপদ্বীপ ও ভারত মহাসাগরের উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলোয় বৃষ্টি কমে যায়।
এই পরিস্থিতি মাঝে-মধ্যে দেখা দেয়। সাধারণত উত্তর গোলার্ধের শরৎকাল, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে আইওডির তীব্রতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।
বৃষ্টির ধরন ছাড়াও আইওডির কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বায়ুর মান এবং এশীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বা ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যাও পরিবর্তিত হতে পারে।
ইএনএসও ও আইওডি ভিন্ন এবং স্বাধীনভাবে পরিচালিত প্রক্রিয়া। আইওডি ঘটে ভারত মহাসাগরে, আর এল নিনো সাউদার্ন অসিলেশন প্রশান্ত মহাসাগরে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুই প্রক্রিয়া এক সঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে। এটি মহাসাগরের আবহাওয়া, বায়ুপ্রবাহ ও বায়ুচাপের ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে, যা অন্য মহাসাগরের পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করে।
আইওডি ও এল নিনো একই সময়ে ঘটলে কী হয়?
যখন এই দুই প্রক্রিয়া একসঙ্গে ঘটে, তখন তা বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
সাধারণত আইওডির ‘ইতিবাচক’ পর্যায় ও সক্রিয় এল নিনো একসঙ্গে দেখা দিলে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় শুষ্ক পরিস্থিতি আরও বেড়ে যায়। একইভাবে লা নিনা পর্যায় সাধারণত আইওডির ‘নেতিবাচক’ পর্যায়ের সঙ্গে মিলে যায়, যা এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ায়।
২০০৬ সালে আইওডির ‘ইতিবাচক’ পর্যায় ও এল নিনো একসঙ্গে ঘটেছিল। তখন চরম আবহাওয়া দেখা গিয়েছিল।