ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে...

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

ঢাকা শহরে বর্ষা আসে এক স্বস্তির অনুভূতি নিয়ে। বছরের অন্য সময় যে শহরটাকে শুধু ধুলো, যানজট আর ব্যস্ততায় আটকে থাকা মনে হয়, বৃষ্টি নামলেই সেই শহর হঠাৎ করেই একটু স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে। মধ্যাহ্নের দিকে কালো মেঘ জমে উঠলে অফিসপাড়া থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ত মোড়গুলোতেও যেন এক ধরনের অপেক্ষা তৈরি হয়, ‘কখন বৃষ্টি নামবে, এই ধুলোর শহরে?’। তারপর অপেক্ষার পালা শেষ করে নামে বৃষ্টি। এ শহরে যে কয়টা টিনের চাল বেঁচে আছে, সেই চালের ওপর, অফিসফেরত বাসের জানালা কিংবা রিকশার হুডে টুপটাপ শব্দে শহরটাকে ভিজিয়ে দেয় এই বর্ষণ।

দিনভর অফিস শেষে ক্লান্ত মানুষ যখন বাসায় ফেরার জন্য রাস্তায় নামে, তখন এই বৃষ্টিই কখনো কখনো একটুখানি স্বস্তি হয়ে আসে। যন্ত্রণাও আছে বৈকি! শহরের জলাবদ্ধতা। তারপরেও গরমে হাঁসফাঁস করা ক্লান্ত শরীর আর মন, আর ধুলোমাখা শহরটা ধুয়ে-মুছে কিছুটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

গাড়ির কাঁচে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা, রাস্তায় হেডলাইটের প্রতিফলন, ফুটপাতের পাশে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ—সব মিলিয়ে ক্লান্ত বিকেলটাও তখন কিছুটা সহনীয় হয়ে ওঠে। অফিসফেরত মানুষের চোখে তখন আর শুধু ক্লান্তি থাকে না, একটু শান্তিও জমে। এই শহরে প্রতিদিনের যান্ত্রিক জীবনের ভেতর বর্ষা যেন ছোট্ট এক বিরতি।

Rain
ছবি: স্টার

ঢাকার বর্ষা মানেই শুধু বৃষ্টি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহুরে জীবনের বহু ছোট ছোট অনুভূতি। ভেজা রাস্তায় ধীরে চলা রিকশা, রাস্তার পাশে ভুট্টা বিক্রেতার আগুন, বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখা কিংবা হঠাৎ আটকে গিয়ে অপরিচিত কারও সঙ্গে গল্প জুড়ে দেওয়া—এসবও বাঙালির বর্ষার অংশ।

এই ঋতু মানুষকে অকারণেই একটু আবেগী করে তোলে বৈকি। হয়তো তাই পুরোনো গান শুনতে ইচ্ছে করে, কারও কথা মনে পড়ে কিংবা শুধু জানালার পাশে বসে থেকে গোধূলির বেগুনী সময়টাও দেখতে ভালো লাগে। মা হয়তো তখন চুলায় খিচুড়ি চড়ান, আর আমি হাতে এক কাপ কফি নিয়ে নিজের ব্যস্ততায় ঢুকে পড়ার চেষ্টা করি...

এই যান্ত্রিক শহরে বর্ষার প্রাকৃতিক রূপ দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। যেমন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ষার আবহটা অনুভব করা যায় আরেকটু বেশি। কলাভবনের পুরোনো দেয়াল বৃষ্টির জলে আরও গাঢ় হয়ে ওঠে, আর কার্জন হল যেন হঠাৎ করেই এক অন্য রঙে রাঙা হয়। লাল ইটের সেই ঐতিহাসিক স্থাপনার চারপাশে জমে থাকা স্নিগ্ধতা, ভেজা ঘাস আর পাতার ফাঁকে জমে থাকা জলের ফোঁটা—সব মিলিয়ে মনে হয় শহরের ভেতরেও কোথাও এক টুকরো প্রকৃতি বেঁচে আছে।

Rain
ছবি: স্টার

টিএসসি থেকে কলাভবন আর কার্জন হলের সামনে হাতে ঝুড়ি নিয়ে কেউ কেউ কদম ফুল বিক্রি করে। বর্ষার অন্যতম প্রতীক এই কদম ফুল। যদিও এখন নাকি বছরে তিন বার ফোটে, এমন কদম পাওয়া যাচ্ছে। এই গোল হলুদ আর মৃদু ঘ্রাণযুক্ত ফুলগুলো দেখলেই বোঝা যাবে প্রকৃতিতে বর্ষার আগমন হয়েছে। ক্যাম্পাসে হয়তো এমনি বসে আছি কিংবা ফুলের দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, ওমনি নিয়ে নেই তিন-চারটে কদম ফুল। আমার মতোন অনেকেই কদম হাতে নিয়ে হাঁটে, কেউ আবার প্রিয় মানুষকে দেয় একমুঠো কদম। ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’—গানটা তো আর এমনি আসেনি!

আর আছে কাঠগোলাপ। বৃষ্টির আগমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোণে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠগোলাপ গাছগুলো হঠাৎ করেই তাদের তীব্র সুবাসে জানিয়ে দেয় নিজেদের উপস্থিতি। বিশেষ করে কার্জন হলের কাঠগোলাপ গাছগুলো অনেকেরই পরিচিত। পাঁচটে বছর এই ক্যাম্পাসের এই গাছটির নিচে বসে অনেক বর্ষামেদুর বিকেল পার করেছি। সাদা আর হালকা হলুদ ফুলের গন্ধে এক ধরনের বিষণ্ণ শান্তিও মিশে থাকে। হয়তো এ কারণেই বর্ষা মানুষকে একসঙ্গে আনন্দ আর হাহাকার দুটোই অনুভব করায়।

বাংলা সাহিত্যেও বর্ষা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গান, কবিতা আর গল্পে বর্ষাকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যেন বৃষ্টি শুধু প্রকৃতির বিষয় নয়, মানুষের মনেরও ভাষা। তিনি লিখেছিলেন—‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়’। রবীন্দ্রনাথের বর্ষা কখনো ভালবাসার, কখনো অপেক্ষার, আবার কখনো বা নিঃসঙ্গতার। তার গানের সুরে বর্ষা যেন মানুষের না বলা কথাগুলোও প্রকাশ করে। যেমন: ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে, জানি নে, জানি নে কিছুতেই কেন যে মন লাগে না’।

Rain
ছবি: স্টার

এই বঙ্গের অনেক কবি, সাহিত্যিকই তাদের লেখায় বর্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। যেমন: জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম এই মৌসুমকে দেখেছেন উচ্ছ্বাস আর দুরন্ত শক্তির রূপে, আবার জীবনানন্দ দাশের লেখায় বর্ষা এসেছে বিষণ্ণ বাংলার মায়া হয়ে।

বাংলার ঋতুচক্রে বর্ষার গুরুত্ব তাই শুধু একটি ঋতু নয়, সাংস্কৃতিকও। এই ঋতু গান এনে দেয়, কবিতা এনে দেয়, মানুষের মনে জমে থাকা ক্লান্তি ধুয়ে দেয়। হয়তো এ কারণেই এত জলজট, দুর্ভোগ আর ভোগান্তির পরও এ যান্ত্রিক শহরের কিছু মানুষ বর্ষাকে ভালোবাসে। হয়তো বর্ষা ভালো লাগে কারণ এই ঋতু মানুষকে একটু ধীরে চলতে শেখায়। ব্যস্ত শহরের মাঝেও মনে করিয়ে দেয়, জীবনে এখনো সৌন্দর্য বেঁচে আছে। মনে করিয়ে দেয়, জীবন এখনো শুধু দৌড় নয়, এর ভেতরেও আছে ঘ্রাণ, সুর আর স্মৃতি।