ইরান যুদ্ধ: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে রেশনিং করবে সরকার

আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা হুমকির মুখে থাকায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। প্রয়োজনে বিদ্যুৎ রেশনিং বা লোডশেডিংয়ের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

গতকাল সচিবালয়ে এক জরুরি বৈঠকে জ্বালানি ব্যবহারে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী হওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। সংকটের প্রেক্ষাপটে খাতভিত্তিক রেশনিংয়ের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মন্ত্রণালয় থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে ইতোমধ্যে একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে স্বল্পমেয়াদে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যার প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানায় পড়তে পারে। তবে রমজানে জনদুর্ভোগ এড়াতে ‘সর্বোচ্চ সতর্ক’ থাকার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

জনসাধারণকে আলোকসজ্জা পরিহার, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। খোলাবাজারে ডিজেল ও পেট্রল বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ এবং জ্বালানি পাচার রোধে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবিকে তৎপরতা বাড়াতে বলা হয়েছে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হাতে যা আছে, তা বিবেচনা করে ব্যবহার করতে হবে। জনগণ সহযোগিতা করলে এই সংকট কাটানো সম্ভব।

তিনি বলেন, এটি শুধু আমাদের সমস্যা নয়, বিশ্বব্যাপী সংকট। সবাই জ্বালানি সংগ্রহের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছে। যুদ্ধের কারণে এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া ধীর হয়ে গেছে এবং স্পট মার্কেট বা খোলাবাজার থেকেও তেমন সাড়া মিলছে না।

প্রতিবেশী ভারতে দাম বেশি হওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকায় ডিজেল বিক্রি বেড়েছে। এ কারণে ওই সব অঞ্চলের পাম্পগুলোতে রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত সেহরি ও ইফতারে লোডশেডিং না হলেও সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এড়ানো কঠিন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মার্চ মাস ভালোভাবে পার করা যাবে। প্রতিশ্রুত সরবরাহ এলে চাপ কমবে। ঈদের ছুটি পর্যন্ত এই সংকট থাকতে পারে।

কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি ‘সহনীয়’ পর্যায়েই থাকবে। তবে সরকারের মূল কৌশল হবে ব্যবহার কমানো। বর্তমানে পিডিবি ১২ থেকে ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। গ্যাস বা তরল জ্বালানির অভাবে ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৩০টি উৎপাদনে নেই।

বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় দৈনিক ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে। গতকাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। এর ফলে দেশের কিছু এলাকায় লোডশেডিং শুরু হয়েছে। 

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক সাংবাদিকদের বলেন, গত দুই দিনে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও কেউ সাড়া দেয়নি। এর দুটি কারণ হতে পারে—সরবরাহকারীরা কাতার থেকে এলএনজি সংগ্রহ করত, যেখানে এখন উৎপাদন বন্ধ; অথবা তারা দাম আরও বাড়ার অপেক্ষায় আছে।

ইতোমধ্যে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ ডলার থেকে বেড়ে ২৫ ডলারে পৌঁছেছে। পেট্রোবাংলা জানায়, মার্চ মাসে হরমুজ প্রণালি হয়ে ছয়টি এলএনজি কার্গো আসার কথা ছিল। এর মধ্যে চারটি নিশ্চিত হয়েছে। ১৫ ও ১৮ মার্চ যে দুটি কার্গো আসার কথা ছিল, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরবরাহকারীরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেনি, তবে নিশ্চিত করাও বাকি আছে।

এর আগে দিনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকে সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা চেয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

পল কাপুর জানিয়েছেন, তিনি ওয়াশিংটনে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে ঢাকার কাছে ফলাফল জানাবেন।