জ্বালানির বিকল্প উৎসের সন্ধানে সরকার
জ্বালানির বিকল্প উৎসের সন্ধানে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালানোয় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এখন জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সরকার ইতোমধ্যে মার্চ মাসের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় এপ্রিল ও মে মাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আমরা বিকল্প নিয়ে ভাবছি। আশা করি শিগগির যুদ্ধ শেষ হবে। কিন্তু পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, যার বেশির ভাগই আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে। অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো এশীয় দেশগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে মূলত এশিয়ার বাজারগুলোতে যায়। তাই অন্য দেশগুলোর শোধনাগারগুলো যদি অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়, তবে পরিস্থিতি বেশ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
জরুরি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও কয়েকটি আফ্রিকান দেশ থেকে আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের মতো সরবরাহকারী দেশগুলো থেকে আমদানি বাড়ানোর চিন্তাভাবনাও চলছে।
সরকারি তথ্যমতে, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক ও কাতার ছাড়াও সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৮ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ২০ লাখ ৬৯ হাজার টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এর ৭৭ শতাংশই এসেছে সৌদি আরব, ইরাক, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৩৫ শতাংশ তেল এসেছে সৌদি আরব থেকে এবং প্রায় ৩০ শতাংশ এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।
আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে শোধন করে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও জেট ফুয়েলসহ প্রায় ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৮ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৩ লাখ টন পেট্রল আমদানি করেছে, যার মাত্র ৫ শতাংশ ওমান ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এসেছে। এই সময়ে প্রায় ৩৯ লাখ ৭ হাজার টন ডিজেল এবং ১৭ লাখ ৪৩ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানি করা হলেও এর কোনোটিই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসেনি।
বিপিসি এ বছর ভারত থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টনের বেশি ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরুর পর অতিরিক্ত ৫০ হাজার টন চাওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ৭৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। গত দুই দিনে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন দিয়ে প্রায় ৫ হাজার টন ডিজেল এসেছে। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত এই পথে মোট ১০ হাজার টন ডিজেল এল।
সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও তেলের পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারির জন্য ‘প্যানিক বায়িং’কে দায়ী করেছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, গত পাঁচ দিনে তেলের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি ছিল, যার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না।
যশোর-৩ আসনের এই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যত দীর্ঘ হবে, বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের ঝুঁকি তত বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৮ মার্চ পর্যন্ত মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
এদিকে বিপিসির চট্টগ্রাম কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত মোটরসাইকেলের জন্য দৈনিক জ্বালানি সরবরাহের সীমা বাড়িয়ে পাঁচ লিটার করা হয়েছে। এর আগে মোটরসাইকেলের জন্য দৈনিক কোটা ছিল দুই লিটার। জ্বালানি দেওয়ার আগে মোটরসাইকেলের নিবন্ধন নম্বর ও চালকের তথ্য সংশ্লিষ্ট রাইড শেয়ারিং অ্যাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পাম্পগুলোকে।