ইরান যুদ্ধের আঁচ দেশের রান্নাঘরে

আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান
সুকান্ত হালদার
সুকান্ত হালদার

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গতকাল বৃহস্পতিবার এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডারের দাম প্রায় ২৯ শতাংশ বাড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি এবং সরবরাহকারীদের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মধ্যেই এমন সিদ্ধান্ত এলো।

এই সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আঁচ সরাসরি পড়তে যাচ্ছে দেশের মানুষের রান্নাঘরে। নতুন দাম অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এখন পড়বে এক হাজার ৭২৮ টাকা।

প্রতি সিলিন্ডারে খুচরা মূল্য ৩৮৭ টাকা বেড়েছে, যা ২০২১ সালের এপ্রিলে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ শুরু করার পর থেকে এক মাসের ব্যবধানে অন্যতম সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি।

মূলত বিশ্ববাজারে এলপিজির কাঁচামালের গড় দাম এক মাসের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় এমনটি হয়েছে—যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি অস্বাভাবিক উল্লম্ফন।

এ ছাড়া জাহাজ ভাড়া (ফ্রেইট) এবং শিপমেন্ট সংক্রান্ত প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে গেছে, যা স্থানীয় খুচরা বাজারে এই তীব্র মূল্যবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

সংশোধিত মূল্য অনুযায়ী, কমিশন প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৪৪ টাকা নির্ধারণ করেছে। ফলে সাড়ে পাঁচ কেজি থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারের দাম হবে ৭৯২ টাকা থেকে শুরু করে ছয় হাজার ৪৮২ টাকা পর্যন্ত।

যানবাহনে ব্যবহৃত এলপিজি বা অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৭৯ দশমিক ৭৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত মাসে ছিল লিটার প্রতি ৬১ দশমিক ৮৩ টাকা।

যদিও মার্চ মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা, তবে মাসজুড়ে সাধারণ গ্রাহকদের বাজার থেকে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা দরে তা কিনতে হয়।

মার্চের শেষ দিকে দাম পুনরায় বাড়তে শুরু করে। এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সর্বশেষ সিদ্ধান্তের আগেই অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা প্রতি সিলিন্ডার এক হাজার ৯০০ থেকে  দুই হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

কর্মকর্তারা জানান, দাম ঘোষণার আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক অংশীজন সভায় ব্যবসায়ীরা একটি ভিন্নমত সংবলিত নোট (নোট অব ডিসেন্ট) জমা দেন। তাদের দাবি, এই মূল্য কাঠামোটি ‘অবাস্তব’, কারণ তারা স্থানীয় বাজারে আরও বেশি দাম বাড়বে বলে প্রত্যাশা করেছিলেন।

ব্যবসায়ীদের যুক্তি, এপ্রিল মাসের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেসব ব্যয়ের উপাদান বিবেচনা করা হয়েছে, তার তুলনায় তারা মার্চ মাসের শুরু থেকেই অনেক বেশি জাহাজ ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) পরিশোধ করে আসছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘মার্চজুড়ে এলপিজি বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছিল, যা বাজারের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতির ওপর প্রভাব ফেলেছে।’

নিয়ন্ত্রক সংস্থা এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রধান সূচক বিবেচনা করে, যার মধ্যে রয়েছে সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি), বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যয়।

তিনি আরও বলেন, ‘সৌদি সিপি একটি জনসমক্ষে উন্মুক্ত সূচক যা আমদানিকারকরা সহজেই জানতে পারেন। এর অর্থ হলো, কোম্পানিগুলো সাধারণত আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামা সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত থাকে এবং সেই অনুযায়ী তারা দাম বাড়িয়ে দেয়।’

জালাল আহমেদ বলেন, ‘বিইআরসি-নির্ধারিত দাম মেনে চলা বাধ্যতামূলক।’ এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থার তদারকি আরও জোরদার করতে তারা সরকারকে জেলা প্রশাসনের সহায়তা নেওয়ার অনুরোধ জানাবেন বলেও উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশে এলপিজি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশে মাসিক চাহিদা সাধারণত এক লাখ ২০ হাজার থেকে এক লাখ ৫০ হাজার টন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি আমদানিকারকেরা এপ্রিল মাসের সরবরাহের জন্য প্রায় এক লাখ ৮৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি করতে পেরেছেন।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের সিইও তানজীম চৌধুরী বলেন, বিইআরসি যে ১২০ ডলার আমদানি প্রিমিয়াম নির্ধারণ করেছে, তা বাজারের বর্তমান বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমদানি প্রিমিয়াম ৩০০ থেকে ৩৫০ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা বর্তমানে অধিকাংশ এলপিজি সরবরাহকারীকে বহন করতে হচ্ছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যখন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করেছিল, তখন সরকার নিজেই আমদানি প্রিমিয়াম প্রায় ১৬৫ ডলার প্রাক্কলন (হিসাব) করেছিল।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি বিইআরসির ১২০ ডলার আমদানি প্রিমিয়াম নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বলেন, এ ধরনের দাম সরবরাহকারীদের জন্য অসহনীয় লোকসান ডেকে আনতে পারে।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক তানভীর আহমেদ মোস্তফা বলেন, তাদের কোম্পানি সব সময় জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে।

বিশ্ববাজারের এলপিজি সূচক এবং জাহাজ ভাড়ার প্রিমিয়াম, বিশেষ করে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পণ্য সংগ্রহের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কৌশলগত পণ্য সংগ্রহ এবং একটি সহযোগিতামূলক নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে দায়িত্বশীলভাবে সেবা দিতে পারব।’

সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এলপিজি সরবরাহের সংকট ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। বড় আমদানিকারকদের বাজারে না থাকা এবং উদীয়মান সরবরাহকারীদের মধ্যকার পরিবর্তনের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে দাম অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় সরকারের নির্ধারিত এই মূল্য অবাস্তব।’

যদিও বেশির ভাগ আমদানিকারক নির্ধারিত হার অনুসরণ করে, তবে দাম মূলত খুচরা পর্যায়ে বাড়ে।

‘এটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে,’ উল্লেখ করে তিনি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, আমদানিকারকদের দাবি যাচাই করার জন্য তারা পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি কোম্পানিকে তদারকির আওতায় আনার কথা বিবেচনা করছেন।