এলপিজির চলমান সংকট কৃত্রিম, ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ ব্যবসায়ীদের
ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে বেশ কয়েকটি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবে দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য সরবরাহ যথেষ্ট রয়েছে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকরা।
দেশে বছরে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন এলপিজি প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে মাসিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন।
গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যবসায়ীরা প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেন, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি।
গতকাল রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের এক জরুরি বৈঠকে এ তথ্য সামনে আসে। ওই বৈঠক সম্পর্কে অবগত সূত্র দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য জানিয়েছে।
বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি) জানায়, 'এলপিজির সামগ্রিক মজুত সন্তোষজনক অবস্থায় আছে।'
এ সময় তথাকথিত সংকটের অজুহাতে যারা বাজারে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ব্যবসায়ীরা।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বিবৃতিতে জানায়, 'ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং বাজারে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আমাদের অনুরোধ, বাজার তদারকি আরও জোরদার করা হোক, যেন সরকার নির্ধারিত ও ন্যায্য দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত হয় এবং এ খাতে স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।'
তবে ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, বর্তমানে এলপিজি আমদানিতে তারা একাধিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন। সরকার এখনই হস্তক্ষেপ না করলে ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তারা।
আমদানিকারকদের অভিযোগ, কিছু পাইকার ইতোমধ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে, ফলে বাজারে এলপিজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
এদিকে গতকাল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানুয়ারির জন্য এলপিজির জন্য নতুন দাম ঘোষণা করেছে।
ঘোষণা অনুযায়ী, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা, যা গত বছরের ডিসেম্বরের চেয়ে ৫৩ টাকা বেশি।
তবে বাজারে বাস্তবে চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন, বিভিন্ন খুচরা দোকানে এই সিলিন্ডার প্রায় ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে অনেক গ্রাহককে একাধিক দোকান ঘুরতে হয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা দাবি করেছেন, তাদের কাছে সিলিন্ডার মজুত নেই।
দ্য ডেইলি স্টার অন্তত পাঁচজন খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে মাত্র একজন জানান, তার কাছে গ্যাস আছে এবং তিনি ১ হাজার ৮৫০ টাকা দরে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৮ শতাংশই আমদানি করা হয় এবং ২৫টির বেশি বেসরকারি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করে। এর মধ্যে ওমেরা, ফ্রেশ, বসুন্ধরা, বিএম ও যমুনা, এই পাঁচ কোম্পানি মিলেই বাজারের প্রায় ৫৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অধিকাংশ আমদানিকারক অংশ নেন।
ওই বৈঠকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সূত্র দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেশিরভাগ শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি এলপিজি আমদানি কমিয়ে দিয়েছে, তবে কয়েকটি কোম্পানি আমদানি বাড়িয়েছে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে এমজেএল বাংলাদেশ, ডেলটা ও মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজসহ অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান আমদানি সীমা বাড়ানোর জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিল। তবে মন্ত্রণালয় এসব আবেদন গ্রহণ করেনি।
বৈঠক শেষে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, 'আমরা তাদের জানিয়েছি, এ ধরনের সক্ষমতা বাড়ানোর একমাত্র কর্তৃত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। তাই পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য তাদের বিইআরসিতে আবেদন করতে বলা হয়েছে।'
এলপিজি আমদানিকারকরা আরও জানান, লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) বা ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রেও তারা নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন।
মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, 'এলপিজি একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, তাই ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনুরোধ জানাতে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করব।'
মনির হোসেন চৌধুরী জানান, এ ছাড়া আমদানি পর্যায়ে এলপিজির ওপর ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজি আমদানির তথ্য জানানোর অনুরোধ জানানো হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমদানিকারকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জাহাজভাড়া ও পরিবহন ব্যয়। যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ২৯টি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যেগুলো এতদিন এলপিজি আমদানিতে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
'এখন আমদানিকারকরা বিকল্প জাহাজ খুঁজছেন, তবে জাহাজ সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে,' যোগ করেন তিনি।
এদিকে নতুন মূল্য ঘোষণা প্রসঙ্গে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনকে বাজার তদারকি জোরদার করতে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জানুয়ারি মাসের জন্য যানবাহনে ব্যবহৃত এলপিজির (অটোগ্যাস) দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি লিটার ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা, যা আগের মাসে ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা ছিল।