কৃত্রিম ঘাটতিতে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম আকাশছোঁয়া

মোহাম্মদ সুমন
মোহাম্মদ সুমন
আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান

পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও সরবরাহকারী ও ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৫০ থেকে ৯০০ টাকা বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ‍্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।

সরকার জানুয়ারি মাসের জন্য স্ট্যান্ডার্ড ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তারা এই সিলিন্ডার বিক্রি করছেন এক হাজার ৬৫০ টাকা থেকে দুই হাজার ২০০ টাকায়। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ১৪ দশমিক ৬৫ লাখ টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য বেশি। এর মধ্যে মোট আমদানির ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে বছরের শেষ ছয় মাসে। এই আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা, যা বছরওয়ারি হিসাবে প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ কম।

এলপিজি আমদানির শীর্ষে ছিল মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, ওমেরা পেট্রোলিয়াম, যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার, সান গ্যাস, ইউনাইটেড আইগাজ এলপিজি, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি, ডেল্টা এলপিজি, বসুন্ধরা এলপি গ্যাস, প্রিমিয়ার এলপিজি ও বিএম এনার্জি।

ঢাকায় ডিলারদের অভিযোগ, এলপিজি কোম্পানিগুলো নিজেরাই বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রি করছে।

সদরঘাট এলাকার ডিলার সাইফুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার এক হাজার ১৫০ টাকায় কিনে নির্ধারিত এক হাজার ৩০৬ টাকায় বিক্রি করার কথা। কিন্তু কোম্পানিগুলোই এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে এক হাজার ৩৪০ টাকায় সিলিন্ডার দিচ্ছে। এতে খুচরা পর্যায়ে সরকারের নির্ধারিত দামে বিক্রি করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।'

ডেইলি স্টার অন্তত চারটি কর চালান নথি থেকে দেখেছে, ৪ থেকে ৭ জানুয়ারির মধ্যে একটি শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রতিটি সিলিন্ডার এক হাজার ৩০২ থেকে এক হাজার ৩২৯ টাকায় এক ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে বিক্রি করেছে। ওই চালানগুলোতে ইউনিট মূল্য দেখানো হয়েছে এক হাজার ২২১ ও এক হাজার ২৪৮ টাকা, যার সঙ্গে অতিরিক্ত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানুয়ারি মাসের জন্য যে দাম নির্ধারণ করেছে, সে অনুযায়ী কোম্পানিগুলোর ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে প্রতিটি সিলিন্ডার এক হাজার ১৫৮ টাকায় বিক্রি করার কথা ছিল। আর ডিস্ট্রিবিউটরদের খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করার কথা ছিল এক হাজার ২০৮ টাকায়।

তবে গতকাল বুধবার রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকার এক খুচরা বিক্রেতাকে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার গ্রাহকদের কাছে দুই হাজার ১০০ থেকে ২,২০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।

তিনি বলেন, 'আমাকে ডিলারদের কাছ থেকে প্রতি সিলিন্ডার এক হাজার ৮৮০ টাকা থেকে এক হাজার ৯০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আবার তিন-চার দিনে মাত্র ১০ থেকে ১২টি সিলিন্ডার পাই, অথচ প্রতিদিন চাহিদা ৩০টিরও বেশি।'

চট্টগ্রামে আগ্রাবাদ, কাজীর দেউরি, চকবাজার, অক্সিজেন ও মুরাদপুর এলাকার ১২টি খুচরা দোকান ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি দোকান জানিয়েছে, তাদের কাছে গ্যাসভর্তি কোনো সিলিন্ডার মজুত নেই।

রহমত এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক আবুল হোসেন বলেন, 'আমরা যেহেতু বাড়তি দামে এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছি, তাই খুচরা বিক্রেতারাও বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।' তার দোকানে আই-গ্যাস ও ওমেরা ব্র্যান্ডের ১২ কেজির সিলিন্ডার এক হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছিল।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা এবং শীতকালে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমদানি স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বাজারে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, 'আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতিও স্থিতিশীল হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করছি।'

আমদানিকারকরা নিজেরাই উচ্চ মূল্যে পণ্য বিক্রি করছেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তিনি বলেন: 'আমি বলতে পারি না যে আমরা সবাই সৎ। যদি কেউ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে, তাহলে তাদের নাম প্রকাশ করা উচিত।'

সরকারের নিষ্ক্রিয়তার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'গত এক বছরে আমরা বারবার আমদানির পরিমাণ বাড়ানো ও কোম্পানিগুলোর বিতরণ ইউনিট সম্প্রসারণের অনুমতি চেয়েছি। কিন্তু গত নভেম্বরে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। এটি একটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত।'

এদিকে, এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি আজ বৃহস্পতিবার থেকে জ্বালানিটির বিপণন ও সরবরাহ কার্যক্রমে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে।

যদিও সংগঠনটি আগে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিল, তবে গত রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ব্যবসায়ীরা কোম্পানির প্ল্যান্ট থেকে আর এলপিজি সংগ্রহ করবেন না।

বিতরণ ও খুচরা পর্যায়ে কমিশন বাড়ানোর দাবিতে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের পরই এই সিদ্ধান্ত আসে।

সংগঠনটির সভাপতি সেলিম খান বলেন, 'আমাদের সম্মতি ছাড়াই বিইআরসি জানুয়ারির দাম নির্ধারণ করেছে। এই দামে আমরা সিলিন্ডারই কিনতে পারছি না। এর ওপর প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে।'

সংগঠনটি বিতরণ কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা এবং খুচরা কমিশন ৪৫ টাকা থেকে ৭৫ টাকা করার দাবি জানায়। পাশাপাশি প্রশাসনের অভিযানের নামে 'হয়রানি' বন্ধের আহ্বান জানায়।

তারা আগেই সতর্ক করে দিয়েছিল, বৃহস্পতিবারের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিতরণ ও বিপণন কার্যক্রম বন্ধ করে দেবে।

সংগঠনটি মনে করে, দাম বাড়ার মূল কারণ হলো সরবরাহ সংকট।

সেলিম খান বলেন, '৫ কোটি ৫০ লাখ সিলিন্ডারের মধ্যে মাত্র এক কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার কোম্পানিগুলো রিফিল করছে। বাকি সিলিন্ডারগুলো খালি পড়ে থাকায় ডিস্ট্রিবিউটরদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ কোম্পানি কার্যক্রম বন্ধ করায় ডিস্ট্রিবিউটররা দেউলিয়ার মুখে।'

এদিকে, বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (লোয়াব) এলপিজির ওপর ভ্যাট কাঠামো পুনর্নির্ধারণের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে লেখা এক চিঠিতে লোয়াব প্রস্তাব করেছে—উৎপাদন পর্যায়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করে আমদানি পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হোক এবং অগ্রিম কর শূন্য রাখা হোক।