মহেশখালীর বনও ধ্বংসের পথে, আপত্তির পরও ভেতর দিয়ে হচ্ছে পাকা সড়ক
বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার পাকা সড়ক।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একাধিকবার আপত্তি জানানো হলেও তা আমলে নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। আপত্তি সত্ত্বেও চালানো হয়েছে নির্মাণকাজ।
তাদের মতে, পাকা সড়ক নির্মাণ অব্যাহত থাকলে সংরক্ষিত বনটি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ২২ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বনের দুর্গম অংশগুলো উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এতে দখল, বন উজাড় ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের ঘটনা ঘটতে পারে, বলেন কর্মকর্তারা।
এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরাও। নির্মাণকাজের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে গেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)।
হাইকোর্ট বিভাগ ৬ আগস্ট পাহাড় মৌজায় প্রস্তাবিত সড়কের ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।
পরবর্তীতে ৯ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ওই নিষেধাজ্ঞার ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে সড়কের প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটারের বেশি না করার শর্তে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন।
আদালত অবকাশ শেষে দুই সপ্তাহের মধ্যে মূল রিটের শুনানি করতে হাইকোর্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বেলা বলেছে, হাইকোর্টে রিটের শুনানি হতে দেড় মাসের বেশি সময় লাগতে পারে এবং এর আগেই কাজের বড় একটি অংশ শেষ হয়ে যেতে পারে। ফলে বনের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টে শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেয়, বনের ভেতর দিয়ে আগে থেকেই একটি সড়ক রয়েছে এবং চলমান কাজের মধ্যে কেবল বিদ্যমান পথটি পাকা করা হচ্ছে। তবে বন বিভাগ বলেছে, ওই পথটি গড়ে ২ মিটার প্রশস্ত একটি সরু হাঁটা পথ, যার দুপ্রান্তে সীমিত পরিসরে ইটের সলিং রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, বেলা যে রিট আবেদন করেছে, তাতে বন বিভাগ সম্পৃক্ত নয় এবং আদালতের কাছ থেকেও তারা কোনো নির্দেশনা পায়নি।
‘সড়কটি ৫ দশমিক ৫ মিটার বা ১৮ ফুট প্রশস্ত করতে হলে দুই পাশে প্রায় ১৪ ফুট করে পাহাড় ও বনভূমি কাটতে হবে, যা আইনের লঙ্ঘন। তা হলে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব,’ বলেন তিনি।
প্রস্তাবিত সড়কটি শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাটকে কালারমার ছড়ার সঙ্গে যুক্ত করবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ মার্চের শেষ দিকে বন বিভাগকে একটি আধা-সরকারি চিঠি (ডিও লেটার) দিয়ে প্রকল্পটিতে বাধা না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুসারে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও অবৈধ দখল ঠেকাতে ১৯৫৭ সালে মৌজা-১২ এর ১৮ হাজার ২৮৬ একর জমিকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়।
বনটি ১৭ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং এর প্রস্থ সর্বোচ্চ ৬ কিলোমিটার। এখানে অসংখ্য দেশীয় প্রজাতির গাছ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে হরিণ, অজগর, হনুমান ও বানরের বাস।
বনের প্রান্ত থেকে অবৈধ বসতি ছড়িয়ে পড়লেও সংরক্ষিত বনের ভেতরে কোনো সড়ক না থাকায় ভেতরের অংশ তুলনামূলকভাবে অক্ষত রয়েছে।
বনের দুপাশে দৈর্ঘ্য বরাবর দুটি প্রধান সড়ক রয়েছে এবং উভয় পাশ থেকে অবৈধ বসতি প্রায় আধা কিলোমিটার পর্যন্ত বনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
বন কর্মকর্তারা জানান, সংরক্ষিত বনের ভেতরে কিছু জায়গা পরিষ্কার করে পানবরজ গড়ে তোলা হয়েছে।
মহেশখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, সড়ক প্রকল্পটি অবৈধ দখলদারদের উৎসাহিত করেছে এবং ইতোমধ্যে কেউ কেউ বিদ্যমান ট্রেইলের পাশে ঘর নির্মাণ শুরু করেছে।
গত কয়েক মাসে অবৈধ দখলের ঘটনায় বন বিভাগ ছয়টি মামলা করেছে বলেও তিনি জানান।
বন কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, নির্মাণকাজ বন্ধ করতে চাওয়ায় বন কর্মকর্তাদের ভয় দেখাতে ঠিকাদাররা স্থানীয় লোকজন ও দখলদারদের সংগঠিত করেছে।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে গত বছরের সেপ্টেম্বরে নির্মাণকাজ শুরু হয়। বনের জিএম ঘাট প্রান্তে জবরদখলকারীদের বসবাস যে অংশে, সেখানে কংক্রিটের পেভমেন্টের কাজ শেষ হয়েছে, আর কয়েকটি কালভার্টের নির্মাণকাজ এখনো চলছে।
এলজিইডি জানিয়েছে, বন বিভাগের আপত্তির কারণে কাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। আর কালারমার ছড়া প্রান্তে এখনো কোনো কাজ শুরু হয়নি, যেখানে পাহাড় কাটার প্রয়োজন হবে।
মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেন, সড়কটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
‘কিছু কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, কিন্তু বন বিভাগের আপত্তির কারণে আমরা এগোতে পারছি না। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
বন বিভাগ বলেছে, সংরক্ষিত বনের ভেতরে পাকা সড়ক নির্মাণ বিদ্যমান আইনের পরিপন্থী। জাতীয় বননীতি ২০২৫ অনুযায়ী মন্ত্রিসভা ও সরকারপ্রধানের অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
বন কর্মকর্তারা বলেন, স্থায়ী সড়ক নির্মাণ হলে দখল, কাঠ পাচার এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের ঘটনা আরও বেশি ঘটবে।
উপকূলীয় বন বিভাগও জুলাইয়ের শেষ দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করে।
কক্সবাজারের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জামির উদ্দিন বলেন, বন বিভাগ বিষয়টি দেখভাল করছে।
জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত একটি সড়ক কীভাবে বনের ভেতরে অবস্থান করছে, তা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে দেখছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মহেশখালী ইউনিটের সম্পাদক আবু বক্কর বলেন, এই সড়কটি পাকা হলে বনের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।
‘এটি পাহাড়, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করবে।’
এ ব্যাপারে মন্তব্যের জন্য সংসদ সদস্য আলমগীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।