সুন্দরবনে ফাঁদ থেকে উদ্ধার সেই বাঘিনীর অবস্থা সংকটাপন্ন
সুন্দরবনে শিকারিদের পাতা ফাঁদ থেকে উদ্ধার পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীটির শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন। ফাঁদে আটকে গুরুতর জখম, দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকায় তীব্র পানিস্বল্পতায় বাঘিনীটি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশেষত, এক পায়ে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া, পেশী ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ও শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে পড়েছে। শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।
বাঘিনীটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্রে রাখা হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধার অভাব এই সংকট আরও বাড়িয়েছে।
বন বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, অচেতন করার পর তার কেটে বাঘিনীটিকে মুক্ত করা হয়। এরপর খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ কেন্দ্রে নেওয়া হয়। তবে সেখানে স্থায়ী ভেটেরিনারি চিকিৎসক না থাকায় ঢাকার সাফারি পার্ক থেকে একজন চিকিৎসক আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তারের ফাঁদে আটকে থাকা বাঘের ক্ষত সাধারণত গভীর হয় এবং সেখানে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ানোর শঙ্কা থাকে। এ ধরনের ক্ষেত্রে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ, নিয়মিত ক্ষত পরিষ্কার এবং প্রয়োজনে ছোটখাটো সার্জিক্যাল পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
গাজীপুর সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন সাজ্জাদ মো. জুলকারনাইনের তত্ত্বাবধানে বাঘিনীটির চিকিৎসা চলছে। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বাঘিনীটির পুরোপুরি চেতনা ফিরেছে। তার অবস্থা ক্রিটিক্যাল। আগে থেকেই ক্রিটিক্যাল ছিল।'
'তার বাম পায়ের রক্ত চলাচল ঠিক মতো হচ্ছে না। ফলে নার্ভ ও মাসলগুলো ড্যামেজ হয়ে গেছে। তাছাড়া বাঘিনীটির যে বডি ডিফেন্স মেকানিজম, তা নষ্ট হয়ে গেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা জানি ডিহাইড্রেশন হচ্ছে এক নীরব ঘাতক। এর ফলে ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স হয়। আর সে কারণে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়ামের অভাবে ফুসফুসের মাসলগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। এতে হঠাৎ করেই কোনো প্রাণী মারা যেতে পারে। এই বাঘিনীটির ক্ষেত্রেও তেমন আশঙ্কা রয়েছে।'
বাঘিনীটির চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়ে সার্জন সাজ্জাদ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'স্থানীয়দের হামলার শিকার হয়েছি আমরা। এক প্রকার নিরাপত্তাহীনতায় ছিলাম। যে কারণে বাঘিনীটি অচেতন থাকা অবস্থায় গতকাল স্যালাইন পুশ করা সম্ভব হয়নি।'
'তারা মব সৃষ্টি করে বাঘিনীর ছবি তুলতে চাচ্ছিলেন এবং আমাদের ব্যারিকেড দিয়ে আটকে ফেলেছিলেন। ওই অবস্থায় তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য কিছুই করা সম্ভব হয়নি। যদি স্যালাইন পুশ করতে পারতাম, কন্ডিশন আরও ভালো হতে পারতো,' যোগ করেন সাজ্জাদ।
বাঘের এ অবস্থায় কী ধরনের লজিস্টিক ও ইকুপমেন্ট দরকার হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সব থেকে বেশি দরকার তাকে ইলেকট্রোলাইট দেওয়া। ডিহাইড্রেশন যদি সামাল দেওয়া যায়, স্যালাইন দেওয়া যায়, তাহলে সেরে উঠতে সময় লাগে না। সেই সাথে ভিটামিন ও মিনারেলস দরকার। এই অবস্থায় বারবার অ্যানেস্থেশিয়া করার সুযোগ নেই। করলে রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস হবে। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে।'
বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'সুন্দরবন এলাকায় বন্যপ্রাণীদের জন্য একটি ভালো চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করা উচিত। আমি মনে করি, এখানে কমপক্ষে দুজন ডাক্তার দরকার। সেইসঙ্গে আট থেকে ১০ জনের সাপোর্ট স্টাফ। সাফারি পার্ক থেকে এসে যথাযথ সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।'