বিষে ডুবে গেছে খাল

পিনাকী রায়
পিনাকী রায়
মনজুরুল হক
মনজুরুল হক

খালে আর মাছ নেই, বিক্রি হয়ে গেছে আশপাশের ধানখেত। টিনের চাল মরচে ধরে ফুটো হয়ে যাচ্ছে, দুই বছর আগে কেনা ফ্রিজটিও এখন আর কাজ করছে না। পুরো এলাকার সব জলাশয়ের পানির রঙ কুচকুচে কালো।

গাজীপুরের পূবাইল ও টঙ্গী খালের আশেপাশের এলাকার এখনকার চিত্র এমনই।

হায়দারপুর খাল থেকে আসা পানি কারখানা ও বাসাবাড়ির অপরিশোধিত বর্জ্য বহন করে টঙ্গী খাল দিয়ে তুরাগ ও বালু নদীতে নিয়ে ফেলছে। নদীর এই দূষণ শুধু দেখতেই কুৎসিত তা নয়, ডেকে আনছে মারাত্মক বিপর্যয়।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলগুলোর পানি পরীক্ষা করে অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি দেখা গেছে। কিছু পানির নমুনা ছিল খুবই অ্যাসিডিক। একসময় যেসব জলাশয় স্থানীয় মানুষের জীবিকার উৎস ছিল, তা এখন তাদের স্বাস্থ্য ও জীবনধারণের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর, জেলার প্রায় ৭ হাজার শিল্পকারখানা তদারকির দায়িত্বে থাকা পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে পরিদর্শক রয়েছেন মাত্র ৩ জন।

সম্প্রতি শুকুন্দিবাগ এলাকার হায়দারপুর খাল পরিদর্শনে দেখা যায়, পানি কুচকুচে কালো রঙ হয়ে গেছে। টঙ্গীর গাজীপুরা এলাকার শিল্পাঞ্চল থেকে আসা অপরিশোধিত তরল বর্জ্য এসে পানির এই হাল করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ১৯৯০-এর দশক থেকে গাজীপুরজুড়ে শিল্পকারখানা সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিস্থিতি শুরু হয়।

দীর্ঘদিন ধরে লোহার গ্রিল মিস্ত্রীর কাজ করেন শুকুন্দিবাগের বাসিন্দা (৫৬) মতিউর রহমান। 'একসময় আমাদের এলাকার লোকজন এই খালে মাছ ধরত। কিন্তু শিল্পায়ন শুরুর পর থেকেই পানি দূষিত হতে শুরু করে,' দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি।

'এখন আর মাছ নেই। পানি এত ক্ষতিকর হয়ে গেছে যে, খালের বাতাসের প্রভাবেই দুই বছরের মধ্যে আমাদের ঘরের টিনের চাল মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে,' যোগ করেন তিনি।

শুকুন্দিবাগের হারুন মিঞা একসময় ধান চাষ করতেন। কিন্তু এই পানির কারণে এখন আর আবাদ করতে পারি না। 'বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করে দিয়েছি,' ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি।

দূষণের এই ক্ষতিকর প্রভাব এখন ঘরের ভেতরেও পৌঁছে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা লাভলী বেগম জানান, দুই বছর আগে কেনা তার একটা নতুন ফ্রিজ এখন আর চলছে না। 'ইলেকট্রনিকস পণ্যই যাই কিনি না কেন, বেশিদিন টেকে না,' বলেন তিনি।

তিনি জানান, এলাকার ঘরে ঘরে এখন চর্মরোগ ও হাঁপানি।

পাশ্ববর্তী চাঙ্কিরটেক এলাকার কাপড় বিক্রেতা ৫০ বছর বয়সী শাহনাজ বেগম দূষণের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। 'এই পচা গন্ধ থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। দিনে বাইরে কাজ করি। রাতে যখন বাড়ি ফিরি, খালের দুর্গন্ধে ঘরের ভেতরেও থাকতে পারি না,' বলেন তিনি।

মতিউর জানান, পানি কমে গেলে দুর্গন্ধ আরও অসহ্য হয়ে ওঠে। তখন কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা যায় না।

'যেহেতু এখানে থাকি, তাই বাধ্য হয়ে সহ্য করতে হয়। আমরা এখন এইই পচা গন্ধে অভ্যস্ত হয়ে গেছি,' যোগ করেন তিনি।

এলাকার এই বিষাক্ত পরিবেশের কারণে পরিবারগুলোকে সামাজিকভাবেও ছোট হতে হয়। সম্প্রতি এই দূষণের অজুহাতে মতিউরের ভাইয়ের মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে গেছে বলেও জানান তিনি।

'আমাদের এলাকায় কেউ বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এলেও পরে অন্য কোনো বিকল্প পেলে বিয়ে ভেঙে দেয়। অনেকসময় আমরা এই দূষণের গল্প চেপে যাওয়ার চেষ্টা করি এবং চুপচাপ বিয়ের আয়োজন করি,' হাসতে হাসতে বলছিলেন মতিউর।

এই এলাকার হাজীপাড়া, টেকপাড়া, গোজারিয়ার টেক, দিলারটেক, নিমতলী, মাজুখান এবং নিমতলীর বিলের বাসিন্দারাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

দুর্গন্ধের চেয়েও বড় সংকট বায়ুদূষণ

বায়ুদূষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক আবদুস সালাম। তিনি বলেন, এই দুর্গন্ধ রাসায়নিক দূষণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

কিছু রাসায়নিক পদার্থ পানি থেকে বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে মেশে, যা এলাকায় বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানান তিনি।

ধাতু ও টিন ক্ষয়ে যাওয়ার পেছনেও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারকে এই গবেষক বলেন, 'ওয়াশিং প্ল্যান্টগুলোতে তারা ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করে। এতে ক্লোরিন থাকে। এছাড়া অন্যান্য রাসায়নিকের মধ্যে সালফার থাকে। এই রাসায়নিকগুলো ধাতুতে মরচে ও ক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে।'

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দূষণের বড় একটি অংশ আসছে গার্মেন্টস ওয়াশিং প্ল্যান্ট, ওষুধ কারখানা ও রাসায়নিক শিল্পের অপরিশোধিত বা অপর্যাপ্ত পরিশোধিত বর্জ্য থেকে।

ওয়াশিং প্ল্যান্টগুলোতে কস্টিক সোডা, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট এবং সালফারভিত্তিক উপাদান যেমন সোডিয়াম মেটাবাইসালফাইট ব্যবহার করা হয়।

এগুলোর মাত্রা ও পরিশোধনের ধরনের ওপর নির্ভর করে রাসায়নিকগুলো বর্জ্য পানির গুণাগুণ বদলে দেয় এবং জলজ জীবন ও মানবস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে।

শিল্পাঞ্চলের আশেপাশে এবং তুরাগ নদীর উপরিভাগের পানি পরীক্ষায় দেখা গেছে—সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, নিকেল এবং আয়রনের মাত্রা বাংলাদেশ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে অনেক বেশি।

কিছু পানির নমুনায় পিএইচ এর মাত্রা পাওয়া গেছে ২ থেকে ৪, যা এর অতিরিক্ত অ্যাসিডিক বা অম্লীয় অবস্থার কথা জানায়। পিএইচ স্কেল ০ থেকে ১৪ পর্যন্ত হয়ে থাকে। বিশুদ্ধ পানির পিএইচ মাত্রা ৭, আর এর নিচে হলে তা অ্যাসিডিক হিসেবে ধরা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিজবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সেলিম রেজা ডেইলি স্টারকে জানান, গাজীপুরের এসব এলাকার কিছু স্থানে দ্রবীভূত আয়রনের পরিমাণ নিরাপদ সীমার চেয়ে ৫ গুণ, সীসা ৩০ গুণ, ক্রোমিয়াম ৫ গুণ এবং নিকেল ৬ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

২০২৫ সালে 'সায়েন্স ডিরেক্ট'-এ প্রকাশিত 'গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের পানির ভারী ধাতুজনিত দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন' শীর্ষক এক গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক তিনি।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, এই পানি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

নিরাপদ সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতির কারণে এটি প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের জন্য ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

পরিদর্শক সংকট

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল ডেইলি স্টারকে জানান, গাজীপুর জেলায় প্রায় ৭ হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত ৬৮৮ কারখানায় বর্জ্য পরিশোধনে ইটিপি থাকা সত্ত্বেও তারা অপরিশোধিত তরল বর্জ্য বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

এসব কারখানা তদারকির দায়িত্বে থাকা পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে পরিদর্শক রয়েছেন মাত্র ৩ জন। পরিদর্শকসহ মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী ৫ জন।

তিনি বলেন, 'এখানে যদি ৫০ জন পরিদর্শকও দেওয়া হয়, তাহলেও এতগুলো শিল্পকারখানা তদারকি করা সম্ভব নয়।'

তিনি আরও বলেন, 'শুধু শিল্পকারখানাকে এককভাবে দোষ দেওয়া যায় না, কারণ জেলার বহু বাসাবাড়ির পয়োনিষ্কাশন লাইনও সরাসরি খাল ও নদীতে যুক্ত হয়েছে।'

যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড মনিটরিং উইং জানিয়েছে, লোকবল সংকট সত্ত্বেও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে তুরাগ নদী দূষণের দায়ে ৪১টি প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২ কোটি ৯ লাখ টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে।