এক্সপ্লেইনার

মুলতবি প্রস্তাব কী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তোলা পয়েন্ট অব অর্ডারের তাৎপর্য

স্টার অনলাইন ডেস্ক

চলছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশন। গত রোববার প্রথমবারের মতো সংসদে দুটি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। লম্বা সময় পর এ নিয়ে গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠে সংসদ। চলে তর্ক-বিতর্ক, বিধির ব্যাখ্যা।

সংসদ অধিবেশনকে আরও প্রাণচঞ্চল করে তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। নিজস্ব ভঙ্গিতে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি নিয়ে দেওয়া বিএনপির এ বর্ষীয়ান নেতার ব্যাখ্যা ও পয়েন্ট অব অর্ডারে সংসদে উত্তেজনা দেখা দেয়।

গত রোববার পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের উত্থাপিত বৈশ্বিক যুদ্ধকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও জ্বালানী সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় সম্পর্কে আলোচনার জন্য তোলা মুলতবি প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি স্পিকার।

তবে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার ও সংস্কার পরিষদ নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের উত্থাপিত মুলতবি প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন তিনি। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আজ মঙ্গলবার সংসদের সবশেষ বিষয় হিসেবে দুই ঘণ্টা আলোচনার সময় নির্ধারণ করে রুল দেন স্পিকার।

মুলতবি প্রস্তাব কী

জাতীয় সংসদের নিয়মিত কাজ মুলতবি বা স্থগিত রেখে সাম্প্রতিক ও জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনার জন্য যে প্রস্তাব উত্থাপনের অধিকার সংসদ সদস্যদের রয়েছে, তাকেই বলা হয় মুলতবি প্রস্তাব। 

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির দশম থেকে দ্বাদশ (ক) অধ্যায়ে এ সংক্রান্ত বিধি প্রণিত রয়েছে। এ অধ্যায়গুলোর মধ্যে ৬১ থেকে ৭১(ক) পর্যন্ত বিধি রয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক ও জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই উপায়ে সংসদে আলোচনা করতে পারেন সংসদ সদস্যরা। একটি কার্যপ্রণালীর ৬২ আর অন্যটি ৬৮ ধারা অনুযায়ী।

দুটির মধ্যে পার্থক্য হলো—৬২ ধারায় মুলতবি প্রস্তাব তোলা হলে ও স্পিকার ওই প্রস্তাব গ্রহণ করলে আলোচনার জন্য সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা সময় ধার্য করা হয়। ৬৮ ধারায় গৃহীত হলে আলোচনার সময় পাওয়া যায় সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট বা আধা ঘণ্টা।

৬২ কিংবা ৬৮, যে ধারাতেই মুলতবি প্রস্তাব বা আলোচনা উত্থাপন করা হোক না কেন, তার বিষয়বস্তু নিয়ে লিখিত বিবরণ নোটিশ, সংসদের বৈঠক শুরুর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে সংসদ সচিবের কাছে পাঠাতে হয়। সচিব বিষয়টি স্পিকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে জানান।

ছবি: সংগৃহীত

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পয়েন্ট অব অর্ডার ও বক্তব্যের তাৎপর্য

পয়েন্ট অব অর্ডার হলো সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, কোনো বিষয় স্পষ্টকরণ কিংবা সিদ্ধান্তের জন্য কোনো সংসদ সদস্যের উত্থাপিত অভিযোগ বা আপত্তি। এ বিষয়ে স্পিকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা রুল দেন। 

বিরোধীদলীয় নেতার তোলা মুলতবি প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার চারটি পয়েন্ট অব অর্ডার তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

প্রথমটি, নোটিশের বৈধতা নিয়ে। দ্বিতীয়টি, প্রস্তাব উত্থাপনের সময় বিরোধীদলীয় নেতার বিস্তারিত বর্ণনা করা নিয়ে। তৃতীয়টি, মুলতবি প্রস্তাবের বিষয়বস্তু ৬৩ (ঋ) ধারার লঙ্ঘন সম্পর্কিত। আর চতুর্থটি, সংবিধান সংশোধন না সংস্কার হবে, সেই সম্পর্কিত।

মুলতবি প্রস্তাবটি গ্রহণ করে দুই ঘণ্টা আলোচনার সময় নির্ধারণের রুল দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম পয়েন্ট অব অর্ডারটি খারিজ হয়ে যায়। এতে প্রতীয়মান হয়, কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ ধারা অনুসারে বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবটি মঞ্জুর করেছেন স্পিকার।

৬৫ (১) ধারা অনুযায়ী, সংসদ সদস্য মুলতবি প্রস্তাব তোলার সময় কোনো বক্তৃতা করতে পারেন না। শুধু লিখিত বিবৃতিসহ প্রস্তাবটি সংসদে পড়তে পারেন। রোববার সন্ধ্যায় মুলতবি প্রস্তাব তোলার সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে প্রায় আড়াই মিনিট ধরে তার লিখিত বিবরণটি পড়তে দেখা যায়। শেষ পর্যায়ে এক লাইনে তিনি নিজের প্রস্তাবটির সারসংক্ষেপ উত্থাপন করেন।

ছবি: সংগৃহীত

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তৃতীয় পয়েন্ট অব অর্ডারটি বেশ সংবেদনশীল।

কার্যপ্রণালী বিধির ৬৩ (ঋ) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে—‘প্রস্তাবটি এমন কোনো বিষয় সম্পর্কে হইবে না, যাহার প্রতিকার কেবল আইন-প্রণয়ন দ্বারাই হইতে পারে।’

জুলাই সনদের অধীনে সংবিধান সংস্কার কিংবা সংস্কার পরিষদ নিয়ে তোলা এই মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনা যেদিকেই যাক না কেন, শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংশোধন করতে হলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের দশম ভাগ অনুযায়ী বিল উত্থাপন, দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোটে সেটি গ্রহণ এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর সংবিধান সংশোধনী বিলটি আইন হিসেবে গৃহীত হয়। যেমন সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১।

তবে বাংলাদেশের আদালতে প্রচলিত আইনের (ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন) তুলনায় সংসদীয় আইনি প্রক্রিয়া ভিন্ন।

সংসদীয় কার্যপ্রণালীর বিধিভঙ্গ হলো কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রশ্ন, আপত্তি বা অভিযোগ তোলার এখতিয়ার রয়েছে কেবল সংসদ সদস্যদেরই। আর এসব আপত্তির বিষয়ে স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হয়।

চতুর্থ পয়েন্ট অব অর্ডারটি শাব্দিক ব্যাখ্যার অংশ। সংবিধানের ভাষা অনুযায়ী, সংস্কার শব্দের অস্তিত্ব না থাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মূলত সংস্কার শব্দটি শুধরে নেওয়ার আহ্বান জানান।

সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমরা সংবিধান সংশোধন করতে চাই, আমার বিরোধীদলীয় সদস্য কেউ কেউ সংস্কার করতে চায়। পার্লামেন্টের ল্যাঙ্গুয়েজ হচ্ছে, কনস্টিটিউশন হয় প্রণীত হবে অথবা রহিত হবে অথবা স্থগিত হবে অথবা সংশোধিত হবে।’

সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি কমিটি করার প্রস্তাব দেন তিনি। ওই কমিটিতে প্রয়োজনে সংসদের বাইরে দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং বিশিষ্টজন, অংশীজন, পত্রিকার সম্পাদকসহ সবাইকে একীভূত করে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের কথাও বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে সংবিধান সংশোধনের মতো এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় নিয়ে ওঠা এ মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনা নিঃসন্দেহে উত্তেজনাকর হতে চলেছে।