এক্সপ্লেইনার

আইনি নোটিশ কী, এর আইনি ভিত্তি কতটা

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

‘আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে’—খবরে এমন কথা প্রায়ই দেখা যায় বা শোনা যায়। নোটিশে বলা হয়, অমুক কাজ বন্ধ করতে হবে, টাকা পরিশোধ করতে হবে, বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে, না হলে আদালতে মামলা করা হবে। সঙ্গে থাকে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে আদালতে যাওয়া হবে।

আইনি নোটিশ আসলে কী? এটি কি আদালতের আদেশ? নোটিশ পেলেই কি মামলা হয়ে যায়? আর নোটিশে সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ উল্লেখ থাকলে কি সেটা আরও শক্তিশালী হয়ে যায়?

আইনি নোটিশ কী?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী স্নেহাদ্রী চক্রবর্তী। ছবি: সংগৃহীত

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী স্নেহাদ্রী চক্রবর্তী বলেন, ‘আইনি নোটিশ’ বা ‘লিগ্যাল নোটিশ’ বলতে নির্দিষ্ট একটা বিষয়কে বোঝায়, এমন কোনো একক সংজ্ঞা কোনো আইনে নেই। বিভিন্ন আইন ও মামলার ক্ষেত্রে নোটিশের আলাদা ভূমিকা রয়েছে।

সহজভাবে বললে, আইনি নোটিশ হলো কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো যে তার কোনো কাজ, সিদ্ধান্ত বা আচরণ নিয়ে আপত্তি বা দাবি রয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

ধরা যাক, রাকিবের কাছে সাকিবের ৫ লাখ টাকা পাওনা। অনেকবার চেয়েও টাকা না পেয়ে সাকিব আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠালেন, ‘১৫ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ করুন, না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এখানে সাকিব তার দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে জানালেন। কিন্তু নোটিশ পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে রাকিব ৫ লাখ টাকা দিতে আইনগতভাবে বাধ্য হয়ে গেলেন, এমন নয়। সাকিবের দাবি সত্য কি না, টাকা পাওয়ার অধিকার তার আছে কি না, প্রয়োজনে আদালত সেটি নির্ধারণ করবে।

সব মামলার আগে কি নোটিশ দিতে হয়?

আইনজীবী স্নেহাদ্রী চক্রবর্তী বলেন, সব মামলার আগে আইনি নোটিশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। কিছু নির্দিষ্ট আইনে নোটিশের কথা বলা আছে। যেমন, চেক ডিজঅনারের ক্ষেত্রে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় নোটিশের বিধান রয়েছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ৮০ ধারাতেও সরকারের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধরনের মামলা করার আগে নোটিশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট ১৯৫০-এর ৯৬ ধারাতেও নোটিশের বিধান রয়েছে। আবার অনেক দেওয়ানি মামলায় আগে নোটিশ দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ধরা যাক, কেউ তার জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে যেতে চান। অথবা কারও কোনো কাজ বন্ধ রাখতে আদালতের কাছে নিষেধাজ্ঞা চান। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আগে নোটিশ দিতেই হবে—এমন নিয়ম নেই।

তাই কোনো নোটিশের আইনি গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট আইনে ওই নোটিশ দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি না।

আইনি নোটিশ দেওয়া হয় কেন?

যেসব ক্ষেত্রে নোটিশ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, সেখানেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

স্নেহাদ্রী চক্রবর্তী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নোটিশ দেওয়া হয় সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের আগে অপর পক্ষকে সতর্ক করার জন্য। অর্থাৎ তাকে বলা হয়, আপনার এই কাজ বা সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি আছে, আপনি চাইলে এখনই বিষয়টি ঠিক করার বা সংশোধনের সুযোগ নিতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধরা যাক, একটি সরকারি কর্তৃপক্ষ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা কোনো নাগরিকের মতে আইনবিরোধী। তিনি সরাসরি আদালতে যাওয়ার আগে কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়ে বলতে পারেন যে, এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করুন বা আইন অনুযায়ী আপনার করণীয় কাজটি করুন।

এ ধরনের নোটিশকে অনেকটা ‘আগাম সতর্কবার্তা’ হিসেবে দেখা যায় বলে মনে করেন এই আইনজীবী। 

তিনি আরও জানান, নোটিশে সাত দিন, ১৫ দিন বা এক মাসের মতো সময় দেওয়া হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তী সময়ে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, রিট আবেদনসহ অন্য কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আইনের ওপর।

নোটিশে সংবিধানের ধারা থাকলেই কি দাবি শক্তিশালী হয়?

অনেক সময় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের কথা নোটিশে উল্লেখ করা হতে পারে। কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী যে কাজ করার কথা, তা না করলে বা যে কাজ করার কথা নয়, তা করলে তার বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কথা জানিয়ে এমন নোটিশ দেওয়া হতে পারে।

কিন্তু নোটিশে ১০২ অনুচ্ছেদ লেখা হয়েছে বলেই সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী হয়ে যায় না বলে জানান আইনজীবী স্নেহাদ্রী চক্রবর্তী।

ধরা যাক, কেউ ১০২ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে একটা নোটিশ দিলেন। পরে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করতে গেলেন। আদালত যদি মনে করে, ওই রিট আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে নোটিশ দেওয়ার কারণে রিটটি গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে না।

স্নেহাদ্রী চক্রবর্তী বলেন, এ ধরনের নোটিশকে বরং এমন আগাম বার্তা হিসেবে দেখা যায় যে, আপনি আপনার কাজ ঠিকভাবে না করলে আমি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারি। নোটিশ দেওয়া মানেই মামলা হয়ে যাওয়া নয়, মামলা গ্রহণযোগ্য হওয়াও নয়, আর মামলায় জেতার নিশ্চয়তাও নয়।

অর্থাৎ, নোটিশে আইনের ধারা লেখা আছে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই আইন বা সাংবিধানিক বিধানটি ওই ঘটনার ক্ষেত্রে সত্যিই প্রযোজ্য কি না।

নোটিশের জবাব না দিলে কী হবে?

এটাও নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর।

স্নেহাদ্রী চক্রবর্তী বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নোটিশ পেলে তার জবাব দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করে সে বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে তার ওপর। কেউ চাইলে জবাব দিয়ে অভিযোগ বা দাবির বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেন। আবার তিনি মনে করলে নোটিশের দাবি সঠিক নয় বা তার ওপর এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাহলে জবাব নাও দিতে পারেন।

তবে এর মানে এই নয় যে, নোটিশের জবাব না দিলে নোটিশে করা অভিযোগ তিনি মেনে নিয়েছেন।

ধরা যাক, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিয়ে বলা হলো, একটি নির্দিষ্ট কাজ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি কোনো জবাব দিল না। পরে নোটিশদাতা আদালতে গেলেন।

আইনি নোটিশের গুরুত্ব 

আইনি নোটিশকে একেবারে গুরুত্বহীন চিঠি ভাবার কোনো কারণ নেই। আবার এটাকে আদালতের আদেশ হিসেবেও দেখা যাবে না।

কিছু ক্ষেত্রে নোটিশ আইনেই নির্ধারিত একটি বাধ্যতামূলক ধাপ। আবার অনেক ক্ষেত্রে এটি মামলা বা রিটের আগে নিজের দাবি জানানোর, অপর পক্ষকে সতর্ক করার এবং বিষয়টি আদালতের বাইরে সমাধানের সুযোগ দেওয়ার একটি মাধ্যম।

তাই কোনো ‘আইনি নোটিশ’-এর খবর দেখলে শুধু নোটিশ দেওয়া হয়েছে, এটুকু জানলেই পুরো বিষয় বোঝা যাবে না।

দেখতে হবে কোন আইনের ভিত্তিতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে? ওই আইনে নোটিশ দেওয়া কি বাধ্যতামূলক? নোটিশদাতা আসলে কী দাবি করছেন? সেই দাবি মানার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে কি না?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নোটিশের পর কী হওয়ার কথা? কারণ শেষ পর্যন্ত আইনি নোটিশ হলো একটি দাবি, সতর্কবার্তা বা আইনি প্রক্রিয়ার পূর্বধাপ। এটি আদালতের কোনো রায় নয়।