স্মৃতিশক্তি ভালো রাখার ৬ উপায়
আমরা যা পড়ি, দেখি বা শিখি, তার সবকিছু কি মনে থাকে? অবশ্যই না। কিছু বিষয় সহজেই মনে থাকে, আবার কিছু বিষয় কিছুক্ষণ পরই ভুলে যাই। তবে ভালো স্মৃতিশক্তির জন্য কেবল বয়স নয়, আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে পড়ছি, নতুন কী শিখছি, অন্যদের সঙ্গে কতটা মিশছি, এসবেরও প্রভাব আছে স্মৃতির ওপর।
স্মৃতিশক্তি নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বলছেন, কিছু সহজ কৌশল নিয়মিত চর্চা করলে তথ্য মনে রাখা সহজ হতে পারে।
শুধু পড়া নয়, মনে করার চেষ্টা করা
কোনো বিষয় মনে রাখার জন্য বারবার পড়ার অভ্যাস আমাদের অনেকেরই আছে। কিন্তু এর চেয়ে কার্যকর একটি উপায় হলো, কিছুক্ষণ পড়ার পর বই বা খাতা বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করা ‘আমি এইমাত্র কী পড়লাম?’
এরপর বই না দেখে নিজের স্মৃতি থেকে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘অ্যাকটিভ রিকল’ বা ‘রিট্রিভ্যাল প্র্যাকটিস’ অর্থাৎ তথ্য মনে করার অনুশীলন।
বোস্টন কলেজের মনোবিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক এলিজাবেথ কেনসিঙ্গার বলেন, বারবার একই সময়ে পড়লেই হবে না। কিছুদিন বিরতি দিয়ে আবার পড়া ও নিজেকে পরীক্ষা করা বেশি কার্যকর।

তথ্যের সঙ্গে পরিচিত জায়গার ছবি মেলানো
মনে রাখার একটি মজার কৌশল হলো ‘মাইন্ড প্যালেস’ বা ‘মনের প্রাসাদ’। এই পদ্ধতিতে কোনো তথ্যকে পরিচিত কোনো জায়গা বা পথের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়। একে ‘মেথড অব লোকাই’ বলা হয়।
ধরি, বাজার থেকে কিনতে হবে দুধ, ডিম, আপেল ও রুটি। এগুলো শুধু শব্দ হিসেবে মনে রাখার বদলে কল্পনা করি, বাড়ির দরজার সামনে দুধের বোতল, সোফার ওপর ডিম, টেবিলে আপেল আর বিছানার ওপর রুটি রাখা আছে।
পরে তালিকাটি মনে করার সময় বাড়ির জায়গাগুলো একে একে কল্পনা করলে জিনিসগুলোর কথাও মনে পড়ে যেতে পারে।
কেনসিঙ্গারের মতে, ‘মাইন্ড প্যালেস’ কৌশলে একইসঙ্গে স্থান সম্পর্কে ধারণা, ছবি এবং বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক তৈরির বিষয়টি কাজ করে। তাই এটি তথ্য মনে রাখার শক্তিশালী একটি কৌশল হতে পারে।

মজার ছলে শেখা
পড়ার সময় সব সময় গম্ভীর থাকতে হবে, এমন নয়। কোনো বিষয় মজার ছলে শেখা হলে সেটি মনে রাখাও সহজ হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করেন, মজার বা অপ্রত্যাশিত কিছু আমাদের মনোযোগ বাড়ায়। হাস্যরসের সময় মস্তিষ্কে আনন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু রাসায়নিক পরিবর্তনও ঘটে, যা পরে তথ্যটি মনে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তাই কঠিন কোনো বিষয় পড়ার সময় মজার উদাহরণ, গল্প, শব্দের খেলা বা মজার ছবি ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে পড়া যেমন আনন্দের হবে, তেমনি বিষয়টি মনে রাখাও সহজ হতে পারে।
নেভিগেশন অ্যাপের ওপর নির্ভর না করা
এখন কোথাও যেতে রাস্তা খুঁজে বের করার জন্য মোবাইলের নেভিগেশন অ্যাপ খুবই কাজে লাগে। তবে সব সময় প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে পরিচিত জায়গায় মাঝে মাঝে নিজে রাস্তা মনে করে যাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ৫০ জন চালকের ওপর গবেষণা করেন। তারা কতটা নেভিগেশন ব্যবহার করেন এবং তাদের স্থানিক স্মৃতির দক্ষতা কেমন তা পরীক্ষা করা হয়। একটি পরীক্ষায় তাদের ভার্চুয়াল গোলকধাঁধায় বিভিন্ন বস্তুর অবস্থান মনে রাখতে বলা হয়েছিল। দেখা যায়, যারা নেভিগেশন অ্যাপের ওপর বেশি নির্ভর করতেন, তারা এই পরীক্ষায় তুলনামূলক খারাপ করেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, নেভিগেশন অ্যাপ ব্যবহার করা স্মৃতিশক্তির জন্য ক্ষতিকর। বরং পরিচিত জায়গায় মাঝে মাঝে নিজে রাস্তা চিনে যাওয়ার চেষ্টা করলে মস্তিষ্ককে স্থান ও পথ মনে রাখার অনুশীলনের সুযোগ দেওয়া যায়।

নতুন কিছু শেখা
নতুন ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা অর্জনের মতো বিষয় মস্তিষ্ককে নতুন তথ্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন দক্ষতা শেখা ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’ বা মস্তিষ্কের এক ধরনের মানসিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে বয়স বা অসুস্থতার কারণে মস্তিষ্কে কিছু পরিবর্তন হলেও তার কার্যক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে।
ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এলেন বিয়ালিস্টক দ্বিভাষিক মানুষের ওপর দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। ২০০৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, দ্বিভাষিক বয়স্ক মানুষের মধ্যে ডিমেনশিয়ার লক্ষণ এক ভাষায় কথা বলা মানুষের তুলনায় গড়ে প্রায় চার বছর পরে দেখা দিয়েছিল।
তবে ছোটবেলা থেকে দুটি ভাষা জানা এবং বড় বয়সে নতুন ভাষা শেখা এক বিষয় নয়। বিয়ালিস্টক নিজেও এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বয়স্ক ব্যক্তিরা ১৬ সপ্তাহ একটি ভাষা শেখার অ্যাপ ব্যবহার করার পর মনোযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিতে তথ্য ব্যবহারের মতো কিছু মানসিক দক্ষতায় উন্নতি করেছিলেন।
তাই নতুন ভাষা শেখাকে ডিমেনশিয়া ঠেকানোর নিশ্চিত উপায় হিসেবে না দেখে মস্তিষ্কের জন্য একটি কঠিন ও আনন্দদায়ক মানসিক অনুশীলন হিসেবে দেখা যেতে পারে।

মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা
বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলা কিংবা কোনো দলগত কাজে অংশ নেওয়াও মস্তিষ্কের জন্য ভালো হতে পারে।
২০২০ সালের একটি গবেষণায় কয়েক হাজার মধ্যবয়সী ও বয়স্ক মানুষের ওপর কয়েক বছর ধরে নজর রাখা হয়। দেখা যায়, যারা বেশি সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, তাদের মানসিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার হারও তুলনামূলক কম ছিল।
২০২২ সালে প্রকাশিত আরেকটি বড় গবেষণায় ২৯ হাজারের বেশি বয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেও একই ধরনের ফল পাওয়া যায়।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক চারণ রঙ্গনাথ বলেন, সামাজিক সম্পর্ক বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া সামাজিক সম্পর্ক মানুষের মধ্যে কিছু দক্ষতা গড়ে তোলে, যা বয়সের সঙ্গে মস্তিষ্কে স্বাভাবিক পরিবর্তন হলেও মানসিক কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
স্মৃতিশক্তির যত্নে আরও কিছু অভ্যাস
স্মৃতিশক্তি ভালো রাখার কোনো জাদুকরী উপায় নেই। বরং নিয়মিত কিছু ভালো অভ্যাস গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ। পড়ার পর বই বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করা, পরিচিত পথে মাঝে মাঝে নিজে চলা, নতুন কিছু শেখা, শেখার সময় মজার উদাহরণ ব্যবহার করা এবং বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো অভ্যাস মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে পারে।
এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর খাবারও মস্তিষ্কের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস