গাছ থেকে কীভাবে কাগজ তৈরি হয়
প্রতিদিন আমরা কত কাগজই না ব্যবহার করি! বই, খাতা, সংবাদপত্র, কার্টন, কাগজের ব্যাগ; সবই আমাদের পরিচিত। কিন্তু কখনো কি ভেবেছি, গাছের কাঠ থেকে কীভাবে কাগজ তৈরি হয়?
আসলে কাগজ তৈরির ইতিহাস অনেক পুরোনো। হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরের মানুষ প্যাপিরাস নামের এক ধরনের জলজ উদ্ভিদ থেকে কাগজের মতো পাতা তৈরি করত। গাছটির কাণ্ড থেকে আঁশ বের করে পাশাপাশি সাজিয়ে ভিজিয়ে ও চাপ দিয়ে পাতার মতো বানানো হতো। এসব পাতায় চিঠি, গল্প, ধর্মীয় লেখা ও নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লেখা হতো। ‘পেপার’ শব্দটির উৎসও এসেছে ‘প্যাপিরাস’ থেকে।

প্রায় দুই হাজার বছর আগে চীনে কাগজ তৈরির আরও উন্নত পদ্ধতি তৈরি হয়। তখন শণজাতীয় উদ্ভিদ সেদ্ধ করে নরম মণ্ড বা পাল্প বানানো হতো। সেই পাল্প পাতলা করে ছড়িয়ে শুকিয়ে তৈরি করা হতো কাগজ।
পরে কাগজ তৈরির এই পদ্ধতি ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপে একসময় পুরোনো তুলা ও লিনেনের কাপড় কেটে, ভিজিয়ে এবং প্রক্রিয়াজাত করে কাগজ বানানো হতো।
কিন্তু কাগজ তৈরির জন্য পুরোনো কাপড়ের জোগান সব সময় পাওয়া যেত না। তখন মানুষ ভাবল, এমন কী আছে যা সহজে পাওয়া যায় এবং কাগজ তৈরিতে ব্যবহার করা যায়? তখন সামনে আসে কাঠ।
কাঠ থেকে কাগজ তৈরির শুরু
বর্তমানে কাগজ তৈরির জন্য বিভিন্ন ধরনের গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয়। যেমন পাইন, স্প্রুস ও ফারের মতো নরম কাঠের গাছ। আবার ওক, বার্চ ও ইউক্যালিপটাসের মতো শক্ত কাঠের গাছও ব্যবহার করা হয়।
প্রথমে গাছ কেটে কাঠের গুঁড়ি কাগজের কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বড় যন্ত্রের সাহায্যে কাঠের বাইরের ছাল ছাড়ানো হয়। এরপর কাঠগুলো ছোট ছোট টুকরো করা হয়। এই ছোট টুকরোগুলোকে বলা হয় কাঠের চিপস।
এরপর চিপসগুলো পানি ও বিভিন্ন রাসায়নিকের সাহায্যে সেদ্ধ করা হয়। এতে কাঠ নরম হয়ে এক ধরনের মণ্ড তৈরি হয়। এই মণ্ডকেই বলা হয় পাল্প।

পাল্প থেকেই তৈরি হয় কাগজ
কাঠের পাল্পে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সেলুলোজ। উদ্ভিদের কোষের দেওয়ালে থাকা এই পদার্থটি অনেকটা শক্ত ও নমনীয় আঁশের মতো। সেলুলোজ পানি শোষণ করতে পারে, আবার শুকিয়ে গেলে শক্তও হয়। তাই কাগজ তৈরির জন্য এটি খুব উপযোগী।
পাল্প তৈরি হওয়ার পর সেটিকে পানির সঙ্গে মেশানো হয়। এরপর পানিতে মেশানো পাল্প একটি সূক্ষ্ম জালের মতো পর্দার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে সেলুলোজের ছোট ছোট আঁশ একসঙ্গে আটকে গিয়ে পাতলা একটি স্তর তৈরি করে।
তারপর সেই স্তরকে চাপ দিয়ে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া হয়। এরপর শুকিয়ে নেওয়া হয়। শুকিয়ে গেলেই তৈরি হয় কাগজ!
আগে কাগজ তৈরির এই কাজ একটি একটি করে হাতে করতে হতো। এখন বড় বড় কারখানায় আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে খুব দ্রুত একসঙ্গে অনেক কাগজ তৈরি করা যায়
সব কাগজ কি এক রকম
না। খাতার কাগজ, বইয়ের কাগজ, সংবাদপত্রের কাগজ কিংবা কার্টনের কাগজ, সবগুলোর গুণাগুণ আলাদা।
কী ধরনের কাঠের পাল্প ব্যবহার করা হয়েছে, পাল্প কতটা মিহি করা হয়েছে, এর সঙ্গে অন্য কী উপাদান মেশানো হয়েছে এবং কাগজ কতটা পুরু হবে; এসবের ওপর কাগজের ধরন নির্ভর করে।

কাগজ তৈরিতে পরিবেশের কি ক্ষতি হয়?
কাগজ আমাদের খুব প্রয়োজনীয় হলেও এটি তৈরির সময় পরিবেশের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়ে। গাছ থেকে কাঠ সংগ্রহ করতে হয়। আবার কাগজ তৈরির কারখানা থেকে বের হওয়া বর্জ্যপানি ও কিছু রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।
তাই কাগজ তৈরির কারখানাগুলোকে আরও পরিবেশবান্ধব করার চেষ্টা চলছে। অনেক কারখানা উৎপাদনের সময় তৈরি হওয়া বাষ্প থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় শক্তি তৈরি করে। কিছু রাসায়নিক উপাদানও আবার ব্যবহার করা হয়।
পুরোনো কাগজ পুনর্ব্যবহার করেও নতুন কাগজ ও কার্টন তৈরি করা যায়। তাই কাগজ নষ্ট না করে যতটা সম্ভব পুনর্ব্যবহার করা ভালো।
এখন আবার প্লাস্টিকের বদলে কাগজের ব্যাগ ও প্যাকেট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে কাগজ তৈরির পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই কাগজ ব্যবহার করার সময় আমাদেরও একটু সচেতন হওয়া দরকার। অপ্রয়োজনে কাগজ নষ্ট না করা, পুরোনো কাগজ পুনর্ব্যবহার করা এবং সম্ভব হলে পুনর্ব্যবহৃত কাগজ ব্যবহার করা; এগুলো পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।