অনলাইন বিজ্ঞাপন যেভাবে শিশু-কিশোরদের প্রভাবিত করে
বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশুরা অনলাইনে প্রায় সব জায়গাতেই বিজ্ঞাপন দেখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও গেম, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়েবসাইটেও থাকে নানা ধরনের বিজ্ঞাপন।
ইউনিসেফের চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট দীপু মাহমুদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন অনলাইনের বিজ্ঞাপন অনেক বেশি ব্যক্তিভেদে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, একজন যে বিজ্ঞাপন দেখছেন, অন্যজন হয়তো সেটি দেখছেন না। একই ধরনের বিজ্ঞাপন বারবার দেখানো এবং ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেখানোর কারণে শিশুরা সহজেই প্রভাবিত হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এর একটি কারণ হলো, শিশুদের চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পুরোপুরি বিকশিত হতে সময়ের প্রয়োজন হয়।’
অনেক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তাদের জন্য নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন দেখায়। শিশু-কিশোররা অন্যের স্বীকৃতি, বাদ পড়ে যাওয়ার ভয় এবং পুরস্কার পাওয়ার মতো বিষয়গুলোর প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে থাকে। তাই এ ধরনের বিজ্ঞাপনের কৌশলে তারা সহজেই প্রভাবিত হতে পারে বলে জানান দীপু মাহমুদ।

শিশুদের আবেগ কাজে লাগায় বিজ্ঞাপন
শিশু-কিশোরদের পণ্য কিনতে উৎসাহিত করতে বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের আবেগকে কাজে লাগান। হাস্যরস, পুরোনো স্মৃতির অনুভূতি, নিজের সম্পর্কে অনিশ্চয়তা কিংবা উত্তেজনার মতো আবেগ ব্যবহার করে তাদের কোনো পণ্য, গেম বা অভিজ্ঞতার প্রতি আকৃষ্ট করা হয়।
ভিডিও গেমেও এমন কৌশল দেখা যায়। কোনো শিশু গেমের একটি ধাপে আটকে গেলে তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য নেওয়া বা সেই ধাপ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। আবার কোনো গেমে জেতার পর শিশুর যে আনন্দ হয়, সেটিকেও কাজে লাগানো হতে পারে। কারণ, শিশুদের ভালো বা খারাপ আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনো তৈরি হচ্ছে। তাই আবেগনির্ভর বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীল হয়।

বন্ধুদের প্রভাবও কাজে লাগানো হয়
বিশেষ করে কিশোর বয়সে বন্ধুদের কাছে প্রিয় হওয়ার ইচ্ছে বাড়ে। বিজ্ঞাপনদাতারা বিষয়টি কাজে লাগিয়ে কোনো পণ্যকে বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে চলা বা সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার উপায় হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
কিছু বিজ্ঞাপন এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন শিশুর মনে হয় ওই পণ্য না কিনলে সে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে পিছিয়ে পড়বে। এটিকে বলা হয় এফওএমও (ফেয়ার অব মিসিং আউট) বা কিছু থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়।
দীপু মাহমুদ বলেন, ‘অনেক শিশু-কিশোরের অনলাইন চরিত্র বা বিভিন্ন কনটেন্ট নির্মাতার প্রতি আবেগ তৈরি হয়। এ ধরনের একতরফা সম্পর্ককে বলা হয় প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ।’
তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞাপনদাতারা এসব সম্পর্কও কাজে লাগাতে পারেন। যেমন: কোনো চরিত্র বা অনলাইন ব্যক্তিত্ব সরাসরি কোনো পণ্যের প্রচার করতে পারে। আবার সাধারণ ভিডিও বা বিনোদনমূলক কনটেন্টের মধ্যেও কোনো পণ্য এমনভাবে দেখানো হতে পারে, যা বিজ্ঞাপন হলেও সহজে বোঝা যায় না।’
শিশুদের তথ্য দিয়ে দেখানো হয় নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন
শিশুরা অনলাইনে কী করছে, সে সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে। যেমন: তাদের বয়স, অবস্থান বা তারা কী ধরনের বিষয় পছন্দ করছে।
দীপু মাহমুদের ভাষ্য, প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম এসব তথ্য ব্যবহার করে শিশুর অনলাইন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিল আছে, এমন বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে। যেমন: কোনো কিশোর যদি নিয়মিত ভিডিও গেমের কনটেন্ট দেখে, তাহলে তার সামনে নতুন গেম, গেম খেলার যন্ত্র বা বিভিন্ন আনুষঙ্গিক পণ্যের বিজ্ঞাপন আসতে পারে। এআইয়ের উন্নতির ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা কেবল তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণই করছেন না, নতুন কনটেন্টও তৈরি করতে পারছেন। এআই দিয়ে তৈরি এসব কনটেন্ট অনেক বেশি ব্যক্তিভেদে তৈরি ও আকর্ষণীয় হতে পারে। ফলে শিশু-কিশোরদের কোনো পণ্য কিনতে বা বাবা-মাকে কিনে দিতে বলার প্রবণতাও বাড়তে পারে।

বাবা-মায়ের করণীয়
অনলাইনের এসব বিজ্ঞাপন বুঝতে শিশু-কিশোরদের সাহায্য করতে পারেন বাবা-মা। যেমন: সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বিজ্ঞাপন দেখা এবং সেগুলো নিয়ে কথা বলা। সব বিজ্ঞাপন যে সহজে বোঝা যায় না, তা বোঝাতে হবে। লুকানো বিজ্ঞাপন কীভাবে চিনতে হয়, সেটিও শেখাতে হবে।
দীপু মাহমুদ বলেন, ‘সন্তানকে শেখাতে হবে, বিজ্ঞাপনে কোনো পণ্য বা অভিজ্ঞতাকে যেভাবে দেখানো হয়, বাস্তবে তা একই রকম নাও হতে পারে। কোনো বিজ্ঞাপন দেখে তার কেমন লাগছে, তা জিজ্ঞেস করতে হবে। সেই অনুভূতি কীভাবে সামলানো যায়, তা নিয়ে কথা বলা ভালো।’
‘এ ছাড়া, এআই ও অ্যালগরিদম কীভাবে এবং কেন অনলাইন বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়, সে বিষয়ে সন্তানকে ধারণা দিতে হবে’, যোগ করেন তিনি।


