প্যারেন্টিং

‘সন্তানকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ’ করতে গিয়ে ক্ষতি করছেন না তো

রবিউল কমল
রবিউল কমল

বাবা-মায়ের অন্যতম দায়িত্ব সন্তানকে ভালো রাখা, নিরাপদ রাখা ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। তাই সন্তানের পড়ালেখা, খেলাধুলা, বন্ধুত্ব থেকে শুরু করে তার আবেগ ও ভবিষ্যৎ সবকিছু নিয়েই সচেতন থাকেন তারা। কিন্তু এই সচেতনতা কখনো কখনো অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়, আর তখন সন্তানের উপকারের বদলে ক্ষতিই হতে পারে।

সন্তান পালনের এমন প্রবণতাকে বলা হচ্ছে, ‘ইনটেনসিভ প্যারেন্টিং’। অর্থাৎ সন্তানের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা ও নিয়ন্ত্রণ। ১৯৯৬ সালে সমাজবিজ্ঞানী শ্যারন হেইস ‘ইনটেনসিভ মাদারিং’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে হেলিকপ্টার প্যারেন্টিংয়ের তুলনা করা হয়েছে।

Intensive Parenting: Boon or Blessing?

ইউনিসেফের চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালটেন্ট দীপু মাহমুদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, অতিরিক্ত অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে বাবা-মা সাধারণত সন্তানকে সব সময় কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত রাখতে চান। পড়ালেখা, খেলাধুলা, বিভিন্ন কার্যক্রম কিংবা বন্ধুত্ব সবকিছুতেই থাকে তাদের অতিরিক্ত নজরদারি।

তার মতে, সন্তান কোনো সমস্যায় পড়লে তাকে নিজে সমাধান করার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ করাও এ ধরনের অভিভাবকত্বের একটি বৈশিষ্ট্য। ফলে কখনো সন্তানের সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে বাবা-মায়ের নিজের আত্মমূল্যবোধও জড়িয়ে যায়। ফলে সন্তানের ওপর বাড়ে চাপ, আর বাবা-মায়ের জীবনেও তৈরি হয় মানসিক চাপ।

বর্তমানে এই প্রবণতা বাড়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকে অন্য বাবা-মায়ের সন্তান পালনের ছবি ও ভিডিও দেখে অনেকেই নিজের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। ফলে বেশিরভাগ মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ‘মম গিল্ট’ বা সন্তানকে যথেষ্ট ভালোভাবে সামলাতে পারছেন না, এমন অপরাধবোধে ভোগেন।

Snowplow parenting makes for a blissful child but a naive adult – Spartan  Shield

দীপু মাহমুদ মন্তব্য করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও বাবা-মায়ের ওপর প্রত্যাশা বেড়েছে। সন্তানকে সব সময় সময় দিতে হবে, তার আবেগ বুঝতে হবে, পড়ালেখা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে, এমন নানা চাপ তাদের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এছাড়া বাবা-মায়ের নিজেদের শৈশবের অভিজ্ঞতাও সন্তান পালনের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। নিজেরা যে অভাব, একাকিত্ব বা নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন, সন্তানকে তা থেকে দূরে রাখতে গিয়ে অনেক সময় তারা অতিরিক্ত সুরক্ষা দিতে শুরু করেন।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাবা-মায়ের মধ্যেও অতিরিক্ত অভিভাবকত্বের প্রবণতা বেশি দেখা যেতে পারে। কারণ তারা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সন্তান পালনের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ও নিখুঁত ফলাফল আশা করেন।

What Is Gentle Parenting?

দীপু মাহমুদ পরামর্শ দেন, সন্তানের প্রতি গভীর যত্ন ও ভালোবাসা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে শিশুর মনে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, বাবা-মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তাকে সব সময় নিখুঁত বা সবকিছুতে সেরা হতে হবে।

আবার সন্তানের সাফল্যের ওপর বাবা-মায়ের নিজের ভালো থাকা নির্ভর করতে শুরু করলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও চাপ পড়ে। অথচ শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য বাবা-মায়ের নিজেদের ভালো থাকাটাও জরুরি।

তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, প্রতিটি শিশু আলাদা। একই পরিবারের দুই সন্তানও একইভাবে বেড়ে ওঠে না। তাই একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সব শিশুকে বড় করা সম্ভব নয়।

The Isolation of Intensive Parenting - The Atlantic

তাহলে করণীয় কী

তার ভাষ্য, সন্তানকে ভালোবাসবেন, পাশে থাকবেন, তবে তাকে কিছুটা স্বাধীনতাও দিতে হবে। 

তার পরামর্শ হলো, শিশুকে সব সময় ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করবেন না, মাঝে মাঝে নিজের মতো সময় কাটাতে দিন। কোনো সমস্যায় পড়লেই সমাধান করে দেবেন না, নিজে চেষ্টা করার সুযোগ দিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য পরিবারের সঙ্গে নিজের পরিবারের তুলনা করবেন না, সন্তান পালনের কোন বিষয়গুলো পরিবারে আনন্দ আনছে আর কোনগুলো অযথা চাপ তৈরি করছে, তা খেয়াল করুন।

মনে রাখতে হবে, ভালো বাবা-মা হওয়ার অর্থ সবকিছু নিখুঁতভাবে করা নয়। সন্তানের জন্য সবকিছু করে দেওয়ার চেয়ে কখনো কখনো তাকে নিজের মতো করে শেখার সুযোগ দিতে হয়। সন্তানের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ ও  একটু স্বাধীনতা দেওয়াই ভালো।