১৭ দিন ধরে তালা ঝুলছে চা-শ্রমিকদের ক্যামেলিয়া হাসপাতালে
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ডানকান ব্রাদার্সের অধীন ১৫টি চা-বাগানের লক্ষাধিক শ্রমিক ও তাদের পরিবারের চিকিৎসার ভরসাস্থল ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল। কিন্তু এক কিশোরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার জেরে টানা ১৭ দিন ধরে হাসপাতালটি বন্ধ রয়েছে। এতে চিকিৎসা সংকটে পড়েছেন চা-শ্রমিকেরা।
স্থানীয় চা-শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, হাসপাতাল বন্ধ থাকার মধ্যেই এলাকায় অন্তত পাঁচজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৬ মার্চ শমশেরনগর চা-বাগানে অবস্থিত এই হাসপাতালে ঐশী রবিদাস (১৩) নামের এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এরপর নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে চিকিৎসক ও কর্মচারীরা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। গত ২৭ মার্চ থেকে হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
চা-শ্রমিকদের নেতা সীতারাম বীন বলেন, ‘হাসপাতাল বন্ধ থাকায় পালকিছড়া চা-বাগানের রুমি ভর (২৩), কানিহাটি চা-বাগানের মাধুরী তেলী (৪০) ও লক্ষীমুনি তেলী (৮০) এবং আলীনগর চা-বাগানের রাজদেব কৈরীসহ (৫৮) মোট পাঁচজন মারা গেছেন। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় তারা মারা যান।’
তিনি দ্রুত হাসপাতালের সেবাসহ সব ধরনের অস্ত্রোপচার (অপারেশন) চালু করার দাবি জানান।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহসভাপতি শ্যামল অলমিক বলেন, ‘গত ১৭ দিন ধরে ১৫টি চা-বাগানের লক্ষাধিক চা-জনগোষ্ঠী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। চিকিৎসার অভাবে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পত্রিকায় এসেছে। অবিলম্বে ক্যামেলিয়া হাসপাতাল চালু করতে হবে।’
মৃত্যু নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ঐশীর মৃত্যু প্রসঙ্গে তার চাচা রঞ্জিত রবিদাস বলেন, ‘মাথাব্যথা নিয়ে মৃত্যুর আগের দিন বিকেলে ঐশীকে হাসপাতালে ভর্তি করি। রাতে তার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে আমরা বারবার ইমার্জেন্সি ডাক্তার চেয়েছি, কিন্তু কাউকে পাইনি। আমরা তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার (রেফার্ড) কথা বলেছিলাম। কিন্তু ডাক্তাররা জানান, এখানেই সামলানো যাবে। পরে সকালে সে মারা যায়।’
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ সহকারী ব্যবস্থাপক (চিকিৎসক) বাহাউদ্দিন বলেন, ‘রাতে ইমার্জেন্সিতে চিকিৎসক না থাকার অভিযোগটি সত্য নয়। আমরা রাতেই রোগীকে রেফার করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অভিভাবকেরা তখন রাজি হননি। তারা সকালে যাওয়ার কথা বলেন এবং সকালেই রোগীর মৃত্যু হয়।’
ঘটনার পর গত ২৯ মার্চ শমশেরনগর চা-বাগানে জরুরি বৈঠক হলেও হাসপাতাল চালুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে শমশেরনগর চা-বাগান ব্যবস্থাপক ও ডানকান ব্রাদার্সের উপমহাব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামানের ফোনে যোগাযোগ করা হলে একজন সহকারী ব্যবস্থাপক কল ধরে জানান, তিনি ছুটিতে আছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ডানকান ব্রাদার্সের লন্ডন অফিস থেকে হাসপাতালটি পরিদর্শন (ইনস্পেকশন) করা হচ্ছে। দ্রুত হাসপাতালটি চালুর বিষয়ে আমি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছি। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই চা-শ্রমিকেরা আবারও চিকিৎসাসেবা পাবেন।’
নব্বইয়ের দশকে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি চা-শ্রমিক, তাদের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, ‘শুরুতে এই হাসপাতালে সব ধরনের বড় চিকিৎসা হতো। কিন্তু আস্তে আস্তে অনেক কিছু বন্ধ হয়ে যায়। এখন নামমাত্র কিছু চিকিৎসা চলে। তারপরও এটা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। আমরা আগের ক্যামেলিয়া হাসপাতাল চাই।’