চঞ্চল হলেই কি শিশুর এডিএইচডি? বুঝবেন কীভাবে?
চঞ্চলতা শিশুর স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু চঞ্চলতা যদি অতিমাত্রার হয়, মনোযোগে বাধা সৃষ্টি করে এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করে—তখন সেটি নিঃসন্দেহে দুশ্চিন্তার।
শিশুর অতিচঞ্চলতা ও অমনোযোগ বা এডিএইচডি সম্পর্কে কথা বলেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু।
এডিএইচডি কী
অধ্যাপক গোপেন কুমার কুন্ডু বলেন, শিশুর অতিচঞ্চলতা, অতিমাত্রায় আবেগ, অমনোযোগিতাকে বলা হয় অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার (এডিএইচডি)। এই ধরনের শিশুরা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, অতিরিক্ত চঞ্চল ও অমনোযোগী থাকে। ৩ থেকে ১২ বছর বয়সের মধ্যে এডিএইচডির লক্ষণ প্রকাশ পায়, বিশেষ করে ৪ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এইচডির লক্ষণ বেশি দেখা যায়।
বেশিরভাগ শিশুই একটু চঞ্চল থাকে। কিন্তু এই চঞ্চলতা যদি এমন হয় যে তার দৈনন্দিন কাজ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যাহত করছে, তখন এটিকে এডিএইচডি বলা হয়।
কেন হয়
জেনেটিক ও পরিবেশগত কিছু কারণে শিশুর মধ্যে এডিএইচডি দেখা যায়।
জেনেটিক কারণ
জিনগত মিউটেশনের কারণে হয়। একই প্লাসেন্টা থেকে আসা যমজদের যদি একজনের এডিএইচডি থাকে, অন্যজনেরও হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাবা-মায়ের এডিএইচডি থাকলে সন্তানের এডিএইচডি হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
এছাড়া মস্তিষ্কের গঠনগত ত্রুটি যদি থাকে, হরমোনজনিত সমস্যা, মস্তিষ্কের প্রদাহ ও শিশুর জন্মের পরে মস্তিষ্কে কোনো সংক্রমণ, যেমন: মেনিনজাইটিস, মস্তিষ্কের রাসায়নিক তারতম্য ও ভারসাম্যহীনাতার কারণে এডিএইচডি হতে পারে।
পরিবেশগত কারণ
পরিবেশগত কারণগুলো এডিএইচডির ঝুঁকি বাড়ায়। লেড বা সিসার সংস্পর্শ বা যেসব শিশুর শরীরে সিসার পরিমাণ বেশি, আয়রনের ঘাটতি রয়েছে তাদের মধ্যে এডিএইচডি দেখা যায়। ফাস্ট ফুড, চকলেট, সস, বেশি মিষ্টি, কৃত্রিম রঙ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, শিশুর অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এডিএইচডির ঝুঁকি বাড়ায়।
লক্ষণ
১. এডিএইচডি শিশু অত্যন্ত অমনোযোগী ও অতিমাত্রায় চঞ্চল।
২. কোনো জায়গায়, যেমন: স্কুলে শ্রেণিকক্ষে বেশিক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না, বারবার উঠে যায় আবার বসে, অহেতুক দৌড়ায়, ছুটোছুটি করে।
৩. শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে না, বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
৪. স্কুলের ব্যবহৃত জিনিসপত্র যেমন: বই, খাতা, পেন্সিল, কলম, ইরেজার ইত্যাদি হারিয়ে ফেলে।
৫. বেশি কথা বলে, প্রশ্ন করার আগেই আবার কখনো প্রশ্ন শেষ করার আগেই উত্তর দিয়ে দেয়।
৬. কথাবার্তা, স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিক; কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগ না থাকায় ভালো ফলাফল করতে পারে না।
৭. সিরিয়াল মেনে কোনো কাজ করতে পারে না, কোনো কাজ শেষ না করেই অন্যটি ধরে, অনেক সময় একই কাজ বারবার করতে থাকে।
৮. অতিমাত্রায় আবেগী হয়, অল্পতেই রেগে যায়, কখনো কখনো ক্ষিপ্ত ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, বিশেষ করে কোনো কিছুতে বাধা পেলে।
কীভাবে বুঝবেন শিশুর এডিএইচডি আছে কি না
অধ্যাপক গোপেন কুমার কুন্ডু বলেন, আমাদের দেশে অনেকেই অটিজম ও এডিএইচডিকে একই সমস্যা হিসেবে গুলিয়ে ফেলেন। অটিজম এবং এডিএইচডি সম্পূর্ণ আলাদা। এটি বোঝার সহজ একটি উপায় হচ্ছে—অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা কথা বলে না। কিন্তু এডিএইচডি শিশু খুব ভালো কথা বলে। তবে আচরণগত কিছু অসুবিধা থাকে।
শিশু যদি অতিরিক্ত চঞ্চল হয়, অমনোযোগী, অনেক সময় আক্রমণাত্মক আচরণ করে, সিরিয়াল মেনে কোনো কাজ করতে পারে না, অহেতুক লাফালাফি, দৌড়াদৌড়ি, ছুটোছুটি করে, স্থির থাকতে পারে না, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলে—যখন এসব লক্ষণ ৩ থেকে ১২ বছর বয়সের কোনো শিশুর মধ্যে অতিমাত্রায় থাকবে এবং বাড়ি, স্কুল কিংবা অন্য যেকোনো জায়গায় একই আচরণ করবে, তখন বুঝতে হবে শিশুর এডিএইচডি থাকতে পারে।
কোন বয়সে ঝুঁকি বেশি
সাধারণত ৩ থেকে ১২ বছর বয়সের মধ্যে এডিএইডচডি লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে ৪ থেকে ৫ বছর বয়সে এডিএইচডির ঝুঁকি বেশি থাকে। ছোট বয়সে এডিএইচডি শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করে। তাই অল্প বয়সে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব।
চিকিৎসা
অধ্যাপক গোপেন কুমার কুন্ডু বলেন, এডিএইচডির চিকিৎসা মূলত নির্ভর করে শিশুর বয়স, রোগের কারণ, লক্ষণ এবং রোগের মাত্রার ওপর।
শিশুর এডিএইচডি যদি অল্প বয়সে শনাক্ত হয়, মাত্রা কম থাকে এবং কেন হয়েছে তার কারণ জানা যায়, তাহলে সঠিক চিকিৎসায় ওষুধের মাধ্যমে ৭৫-৯০ শতাংশ শিশুই ১০ বছর বয়সে স্বাভাবিক হয়ে যায়। আর বেশি বয়স, যেমন: ১০ বছর বয়সে দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া, রোগের কারণ না জানা ও মাত্রা বেশি থাকার কারণে ১০ শতাংশ শিশুর এডিএইচডি নিয়ন্ত্রণে আসে না। এডিএইচডি চিকিৎসায় কাউন্সিলিং করা, রোগের উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে—এ জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি শিশুর বাবা-মা, স্কুলের শিক্ষকদের জন্য কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা রোগের মাত্রা কমাতে সহায়ক হয়।
অভিভাবকের করণীয়
শিশুকে মনোযোগী করার জন্য সৃজনশীল কাজ করতে দিতে হবে, যেমন: ছবি আঁকা, নাচ, গান, অভিনয় ইত্যাদি। শিশুর প্রতিদিনের রুটিন তৈরি করা এবং সে অনুযায়ী চলার অভ্যাস করানো। শিশুকে ছোট ছোট নির্দেশনা দিতে হবে। কারণ সে বড় নির্দেশনা অনুসরণ করবে না। সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ দেওয়া, ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করা এবং শিশুর প্রতি বাড়তি নজর ও যত্ন নিতে হবে।
শিক্ষকদের করণীয়
এডিএইচডি আক্রান্ত শিশু অনেক বড় ছড়া মুখস্ত কিংবা অনেক বড় অংক করা থেকে বিরত থাকে, করতে চায় না। এজন্য শিক্ষকদের শিশুর পড়া যতটা সম্ভব ছোট এবং নির্দেশনা ছোট ছোট আকারে দিতে হবে। স্কুলে প্রথম সারিতে বসার ব্যবস্থা করতে হবে এডিএইচডি শিশুকে। রুটিনের ভেতর রাখতে হবে এবং শিশুর প্রতি বাড়তি নজর দিতে হবে।



