ঢাকায় শিশুদের ‘নীরব মহামারি’
ঢাকার শিশুরা বর্তমানে গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে এটি তিন ঘণ্টা, আবার কারও ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাও হচ্ছে। আইসিডিডিআর,বির নতুন এক গবেষণায় এ উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
আইসিডিডিআর,বির সহকারী বিজ্ঞানী ও গবেষক শাহ্রিয়া হাফিজ কাকন দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের প্রয়োজনেই শিশুদের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মহামারি শেষ হওয়ার পরও সেই নির্ভরতা কমেনি। বরং এখন তা এক ধরনের আসক্তিতে রূপ নিয়েছে।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কোভিডের সময় আমরা নিজেরাই বাচ্চাদের হাতে মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ তুলে দিয়েছিলাম। তখন শিক্ষা, সামাজিকীকরণ সবকিছুই ডিজিটাল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও শিশুরা সেই স্ক্রিন থেকে বের হতে পারেনি।’
তার ভাষ্য, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ১৭ বছরের কম বয়সীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইমের সুপারিশ করেছে। কিন্তু আমরা দেখছি, শিশুরা তার দ্বিগুণেরও বেশি সময় স্ক্রিনে কাটাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছে যে, চাইলেই শিশুদের এই আসক্তি থেকে সরিয়ে আনা যাচ্ছে না। আমরা অভিভাবক, শিক্ষক সবাই বিষয়টি দীর্ঘদিন উপেক্ষা করেছি।’
শাহ্রিয়া হাফিজ কাকন জানান, গবেষণায় শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নানা প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
‘চোখের সমস্যা বাড়ছে, মানসিক সমস্যার হারও ধরা পড়েছে। এই বয়সে শিশুদের মস্তিষ্ক বিকশিত হয়। এই সময়ে অতিরিক্ত স্ক্রিন এক্সপোজার ভবিষ্যতে আরও জটিল সমস্যা তৈরি করতে পারে,’ বলেন তিনি।
‘বাবা-মাও স্ক্রিনে ডুবে থাকছেন’
শিশুদের স্ক্রিন টাইম বাড়ার পেছনে অভিভাবকদের আচরণও বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি। এই গবেষণায় উঠে এসেছে, বাবা-মায়েরাও দৈনিক প্রায় ৪ ঘণ্টা স্ক্রিনটাইম কাটাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘বাবা-মা অফিস থেকে ফিরে বাসাতেও ল্যাপটপে কাজ করছেন, মোবাইলে নাটক বা অন্য কনটেন্ট দেখছেন। ফলে তারা শিশুদের পর্যাপ্ত কোয়ালিটি টাইম দিতে পারছেন না।’
কাকন বলেন, ‘একটা শিশু যখন বাবা-মার কাছ থেকে সময় পায় না, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ধীরে ধীরে তার জগতটাই মোবাইলনির্ভর হয়ে যায়।’
এ কারণে ভবিষ্যতে অভিভাবকদের জন্যও আলাদা গাইডলাইন তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
‘খেলার মাঠ নেই, শিশুরা মোবাইলেই খেলছে’
গবেষণাটি ঢাকা শহরের ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীদের ওপর করা হয়েছে বলে জানান শাহ্রিয়া হাফিজ কাকন।
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমাদের কোন সুযোগ হলে শহরের সঙ্গে গ্রামের বাচ্চদের তুলনা করে করে দেখব যে, ওদের কি অবস্থা।’
তিনি বলেন, ‘শহর এলাকায় বড় সমস্যা হচ্ছে খেলার জায়গার অভাব। বেশিরভাগ স্কুলেই মাঠ নেই। বাচ্চাদের স্বাভাবিক খেলাধুলার প্রবণতা থাকে, কিন্তু সেই সুযোগ না পেলে তারা মোবাইল গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে।’
তার মতে, কোচিং, প্রাইভেট ও অনলাইন পড়াশোনার চাপে শিশুদের বাস্তব খেলাধুলার সময়ও কমে গেছে।
‘পড়াশোনা অনলাইনে করছে, আবার অবসরে মোবাইলেই গেম খেলছে বা সিনেমা-নাটক দেখছে। অর্থাৎ তাদের বিনোদন, যোগাযোগ, খেলাধুলা সবকিছুই স্ক্রিনকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে,’ বলেন তিনি।
‘এটা শুধু প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, সম্পর্কেরও সংকট’
শিশুদের মধ্যে একাকিত্ব, উদ্বেগ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
‘আমরা ছোটবেলায় মাঠে খেলতাম, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতাম। এখনকার বাচ্চাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই। তারা মোবাইল রেখে দিলে এক ধরনের শূন্যতায় ভোগে,’ বলেন তিনি।
কাকন বলেন, ‘বাবা-মাও কাছে নেই, বন্ধুরাও নেই। তখন একটা লোনলিনেস তৈরি হয়। সেখান থেকে এনজাইটি, বিষণ্নতা, সোশাল ফোবিয়া তৈরি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, বাসায় অতিথি এলে শিশুরা অন্য ঘরে গিয়ে মোবাইল নিয়ে বসে থাকে। আমরা এটাকে সাধারণ বিষয় মনে করছি। কিন্তু এটা উপেক্ষা করার মতো বিষয় না। এটা এখন এক ধরনের “হিডেন প্যান্ডেমিক” হয়ে উঠছে।’
কী করতে হবে?
সমাধানের বিষয়ে শাহ্রিয়া হাফিজ কাকন বলেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ব্যবহারে সীমা থাকা জরুরি।
‘স্ক্রিন আমাদের লাগবেই। মোবাইল-ল্যাপটপ ছাড়া এখন চলা সম্ভব না। কিন্তু এটা একটা বাউন্ডারির মধ্যে থাকতে হবে,’ বলেন তিনি।
তিনি কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন:
শিশুদের স্ক্রিন টাইম ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী সীমিত রাখতে হবে।
ঘুমানোর অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ করতে হবে।
আউটডোর গেম, ব্যায়াম ও শারীরিক কার্যক্রমে শিশুদের উৎসাহিত করতে হবে।
বিকল্প বিনোদন হিসেবে গান শোনা, ইনডোর গেম, গাছের যত্ন নেওয়া বা পাখি পালনের মতো কাজে আগ্রহ বাড়াতে হবে।
বাবা-মাকে নিয়মিত শিশুদের সঙ্গে ‘কোয়ালিটি টাইম’ কাটাতে হবে।
তিনি বলেন, ‘শুধু একই বাসায় থাকলেই হবে না। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শিশুর সঙ্গে গল্প করতে হবে, তার কথা শুনতে হবে। স্কুল বা পড়াশোনার বাইরেও তার জগতটা বুঝতে হবে।’
কাকন সতর্ক করে বলেন, ‘আজ যে শিশু সারাক্ষণ স্ক্রিনে ডুবে আছে, ভবিষ্যতে তার সামাজিক যোগাযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক স্বাস্থ্যে বড় প্রভাব পড়তে পারে। বিষয়টাকে এখনই গুরুত্ব না দিলে সামনে আরও বড় সংকট তৈরি হবে।’