বন্ধ হলো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার সিআইএ ফ্যাক্টবুক

স্টার অনলাইন ডেস্ক

এআই চ্যাটবট আসার আগে বিভিন্ন দেশের জিডিপি, জনসংখ্যা, মৃত্যুহার, জাতীয় ভাষা, জনগোষ্ঠী, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিসহ আরও অনেক ধরনের তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-সূত্র ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর ফ্যাক্টবুক। 

হঠাৎ করেই ওই ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। 

আজ শুক্রবার এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। 

এখন ওয়েবও অ্যাড্রেসে ক্লিক করা হলে সুদৃশ্য ও সুসজ্জিত ওয়েবসাইটের বদলে একটি বিদায়বার্তা সম্বলিত ভিন্ন ওয়েবসাইট দেখা যায়। 

বেশ কয়েক দশক ধরে বিশ্বের হাজারো মানুষের উপকারে আসা ওয়েবসাইটটি গত ৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার ইন্টারনেট থেকে বিদায় নেয়। কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই এটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

যার ফলে, বিশ্বজুড়ে শিক্ষকমন্ডলী, শিক্ষার্থী, লাইব্রেরিয়ান, গবেষক ও উৎসুক নাগরিকরা একটি তথ্যসূত্র থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের অনেকেই কখনোই ভাবেননি তথ্যের এই সূত্রটি উধাও হয়ে যাবে। 

ওকলাহোমা সিটির সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক হেইল সিএনএনকে বলেন, ‘সিআইএ ফ্যাক্টবুক বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের মতো নিখুঁত কোনো সূত্র নয়। তবে অন্য অনেক সূত্রের চেয়ে এটা উন্নত এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটা বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়। এটা সব সময়ই ছিল। (দুর্ভাগ্যজনকভাবে) এখন আর নেই।’

বিশ্বজুড়ে হেইলের মতো অনেক শিক্ষক তাদের শিক্ষার্থীদের স্কুলের অ্যাসাইনমেন্ট বা রিপোর্ট লেখার তথ্য পেতে ফ্যাক্টবুক দেখার নির্দেশনা দিয়ে এসেছেন এতদিন। এমন কী, আন্তর্জাতিক পর্যটকরাও কোনো দেশে যাওয়ার আগে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ভ্যাকসিন সুপারিশের জন্য ফ্যাক্টবুকের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। সাংবাদিকরা তাদের প্রতিবেদনকে আরও সমৃদ্ধ করতে ফ্যাক্টবুক থেকে তথ্য কাজে লাগাতেন। 

বছরের পর বছর ফ্যাক্টবুকে হালনাগাদ তথ্য যোগ করা হোত। আর কোনো নির্ভরযোগ্য সাইটে এককভাবে এত ধরনের তথ্যের সন্নিবেশ ছিল না বলে মত দেন বোস্টন পাবলিক লাইব্রেরির গবেষণা বিশেষজ্ঞ জন ডেভাইন। 

তিনি বলেন, ‘অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। এখন অন্যান্য সূত্র থেকে তথ্য নিতে হবে। কিন্তু, সেগুলোর ওপর কীভাবে ভরসা আনব? কীভাবে আমরা উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোর তথ্য পাব?’

১৯৬২ সালে ‘ন্যাশনাল বেসিক ইন্টেলিজেন্স ফ্যাক্টবুক’ নামে এই উদ্যোগ শুরু হয়। সে সময় এটি সরকারি গোপন নথি বা ‘ক্লাসিফায়েড’ হিসেবে বিবেচিত ছিল যা শুধু সরকার ও সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা দেখতে পেতেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে জনসাধারণের জন্য একটি আনক্লাসিফায়েড সংস্করণ চালু করা হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে ছাপার অক্ষরে এই ফ্যাক্টবুক প্রকাশ পেতে শুরু করে। 

১৯৮১ সালে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক’ নাম পায় এটি। ১৯৯৭ সালে এর ডিজিটাল সংস্করণ চালু হয়। বাকিটা ইতিহাস। 

হঠাৎ করেই সিআইএ জানায়, তারা ফ্যাক্টবুক বন্ধ করে দিচ্ছে। এই বিষয়ে কোনো আগাম সতর্কবার্তা বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সিআইএ’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি। 

ফ্যাক্টবুকের সাইটে ঝোলানো বিদায়বার্তায় বলা হয়েছে, ‘যদিও ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক আর নেই, এর বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা ও ঐতিহাসিক সত্ত্বাকে মাথায় রেখে আপনার গোটা বিশ্ব সম্পর্কে কৌতূহল ধরে রাখবেন এবং এ বিষয়ে জানতে বিভিন্ন উপায় খুঁজে নেবেন—নিজে অথবা ভার্চুয়াল মাধ্যমে।’

আগের তথ্যগুলো কোনো ধরনের আর্কাইভ থেকে পাওয়া যাবে কী না, সে বিষয়ে ওয়েবসাইটে কিছু বলা হয়নি। 

রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ধরনের রূপান্তর ঘটান। সিএনএনের মত, ‘তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে’ প্রাধান্য দিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামে কী কী প্রদর্শন করা হবে, সে বিষয়েও নিজের মত চাপিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি জাতীয় পার্ক সার্ভিসকে ‘দাসত্ব’ নিয়ে যেকোনো ধরনের তথ্য না নির্দেশও দিয়েছেন এর আগে। 

হেইলের মতে, এ বিষয়গুলোর মধ্যে সংযোগ আছে।

 ‘আমার বিবেচনায়, ইউএসএইডের কার্যক্রম বন্ধের মতো একটা বিষয় এটি। একইভাবে স্মিথসোনিয়ানের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ ও ইন্টারনেট থেকে কৃষ্ণাঙ্গ সেনাদের নাম সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এগুলো সব রিপাবলিকানদের নিকৃষ্ট সেন্সরশিপ উদ্যোগের অংশ। মনে হচ্ছে তারা আমাদেরকে মূর্খ জাতি বানাতে চাইছে। আমি শিক্ষক হিসেবে এটা মেনে নিতে পারছি না’, যোগ করেন তিনি।  

হেইল মত দেন, ফ্যাক্টবুকের বিদায়ে শিক্ষক-শিক্ষাবিদ-গবেষকরা বড় বিপদে পড়েছেন। 
তিনি বলেন, ‘কর্পোরেট বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য নিয়ে কাজ করা খুব ঝামেলার। কারণ তারা যখন আন্তর্জাতিক তথ্য, ব্যাংকিং বা মুদ্রা বিনিময়ের হারের মতো বিষয়গুলো উল্লেখ করে, সেগুলোর পেছনে তাদের নিজেদের স্বার্থ জড়িয়ে থাকে এবং কারণে তথ্য মিথ্যাও হতে পারে।’

‘ভুল তথ্য সংশোধন করা যায়। আমরা সেগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমি চাই না শিশুদের সামনে কোনো মিথ্যা আসুক’, যোগ করেন তিনি।