গাজা শরণার্থী মাইসুনের তাঁবুতে রোজা এলো যেভাবে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার মতো গাজার মুসলিমরাও দুই হাত বাড়িয়ে পবিত্র রমজান মাসকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে ‘নিরাপদ আশ্রয়ে’ থাকা অন্যান্য মুসলিমদের মতো শান্তিতে নেই গাজাবাসী। পবিত্র এই মাসটিও উদ্বেগ, আশঙ্কা আরও উৎকণ্ঠায় কাটাবেন তারা।

আজ বুধবার কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে গাজার মধ্যাঞ্চলের এক শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা মাইসুন আল-বারবারাউইর তাঁবুতে রোজা আসার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

রমজান যেমন ইবাদত-সংযমের মাস, তেমনি উৎসবেরও। ঈদকে সামনে রেখে মাসজুড়েই চলতে থাকে উৎসবের আমেজ।

সেই আমেজকে নিজের জীর্ণশীর্ণ তাঁবুর ভেতর ধারণ করার চেষ্টা চালিয়েছেন মাইসুন। কাপড়ের দেওয়ালে হাতে আঁকা রঙিন ছবি ও ঘর সাজানোর উপকরণ ঝুলিয়েছেন। তার পরিবারের সদস্যরাই ছবিগুলো এঁকেছেন।

Gaza demolished building/Reuters

মাইসুন তার নয় বছরের ছেলেকে বলেন, ‘আমরা ছোট লণ্ঠন বাতি ও কিছু সাজানোর উপকরণ এনেছি।'

রমজানে এ ধরনের উপকরণ জোগাড় করতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন মাইসুন।

আল জাজিরাকে মাইসুন বলেন, ‘আমার সাধ্য সীমিত। শিশুদের মন যাতে খুশি থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।’

রমজান নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘গত দুই বছর যুদ্ধ চলার সময় দুঃখ-বিষাদের যে আবহ সবাইকে আচ্ছাদিত করে রেখেছিল, তা থেকে বের হয়ে আসার উপায় হিসেবে ঘর সাজাতে চেয়েছি।’

সবার কাছে উম মোহাম্মদ নামে পরিচিত মাইসুন। ৫২ বছর বয়সী এই নারীর দুইটি সন্তান আছে।

‘বড় ছেলের বয়স ১৫ আর ছোট ছেলের ৯ বছর। জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তারাই,’ যোগ করেন তিনি।

‘একটা দিন ওরা নিরাপদে পার করলেই আমি সেটাকে স্বস্তি ও আনন্দের কারণ হিসেবে দেখি।’

এ কথা বলার সময় তার কণ্ঠে সন্তানদের নিয়ে গর্ব ও তাদের জীবন নিয়ে উদ্বেগ খুঁজে পান আল জাজিরার প্রতিবেদক। মাইসুন জানান, যুদ্ধের প্রতিটি দিন দুই সন্তানকে হারানোর ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াতো।

গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য এবারের রমজান অনন্য। দুই বছর পর ‘অপেক্ষাকৃত শান্ত’ রমজান শুরু করেছেন তারা। এ জন্য তারা হামাস-ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতিকে ধন্যবাদ দেন।

Mysoon's son/Al Jazeera

ইসরায়েলের গণহত্যামূলক হামলায় গত দুই বছরে ৭০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

মাইসুন আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। সবাই জানে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। এখনো সময়ে-অসময়ে কামানের গর্জন শুনি। কিন্তু, যুদ্ধের সবচেয়ে খারাপ অবস্থার তুলনা পরিস্থিতি কিছুটা ইতিবাচক।’

রমজানে শরণার্থী শিবিরের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন মাইসুন। ইফতারের জন্য রুটি বানানো, খেজুর ও পানি সংগ্রহ ও বিতরণে যুক্ত থাকছেন তিনি।

যুদ্ধের কারণে ঘর ছাড়ার পর এটা তাদের তৃতীয় রমজান জানিয়ে মাইসুন বলেন, ‘বাড়িঘর, পরিবারের সদস্য ও অনেক প্রিয়জনকে হারিয়েছি।’

‘তবে এই শিবিরে আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধুরা আছেন। সবাই একই বেদনা ও দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একে অপরকে যেভাবে সম্ভব সাহায্য করতে চাই আমরা।’

যুদ্ধের শুরুর দিকে গাজার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিজ বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন মাইসুন। সঙ্গে ছিলেন স্বামী হাসৌনা ও তাদের দুই সন্তান। একের পর এক শিবিরে মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে অবশেষে বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় পান তারা। কিন্তু, সেখানে ‘পরিস্থিতি খুব খারাপ ছিল’ বলে জানান তিনি।

দীর্ঘ সময় কথা বলে ক্লান্ত হয়ে পড়েন মাইসুন। খানিকটা বিরতি নিয়ে বলেন, ‘শূন্য থেকে শুরু করছি। আনন্দ-স্বস্তি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি। রমজান আসে, ঈদ আসে। চলেও যায়। পরিস্থিতি বদলায় না।’

আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলার সময় মাইসুনের কণ্ঠে আশাবাদ ও আতঙ্কের সুর ঘুরেফিরে আসছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চারপাশের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, ‘রমজান আশীর্বাদ বয়ে এনেছে।’

রমজানের প্রথমদিন মাইসুন ইফতারে কী খাবেন তা এখনো ঠিক হয়নি। সীমিত সাধ্য অনুযায়ী যতটুকু সম্ভব কিছু একটা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে চান তিনি।

তবে রোজা ভাঙার পর প্রার্থনায় কী বলবেন, তা ঠিক করে রেখেছেন মাইসুন।

‘দোয়া করব যাতে যুদ্ধ আর কখনো ফিরে না আসে। প্রতিদিন এই দোয়াই করি। সবকিছু শান্ত হোক। তাদের সেনাবাহিনী আমাদের ভূখণ্ড থেকে সরে যাক।’

এ কথা বলার সময় তিনি গুলিতে ছিঁড়ে যাওয়া তাঁবুর দিকে প্রতিবেদকের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। জানান, কয়েকদিন আগেই ইসরায়েলি ড্রোন থেকে ছোড়া গুলির আঘাতে তার তাঁবু ছিঁড়ে যায়।

মাইসুন একা নন। যুদ্ধ ফিরে আসার ভয়ে আছেন গাজা উপত্যকার অসংখ্য বাসিন্দা।

গত বছর যুদ্ধবিরতির পর রমজানে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছিল। দিনটি ছিল ১৯ মার্চ। রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহে।

নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধে মিশরের সঙ্গে রাফা ক্রসিং বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। ত্রাণ হিসেবে আসা খাবারের জোগান বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে গাজাজুড়ে তীব্র খাদ্য ও মানবিক সংকট দেখা দেয়। এটি কাটিয়ে উঠতে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

তিনি আরও বলেন, ‘গত রমজানে একইসঙ্গে যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ আমাদেরকে আক্রান্ত করে। সে সময় আমার জমানো সব টাকা খরচ হয়ে যায়।’

‘ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ছোট ছেলেটা সে সময় সৃষ্টিকর্তার কাছে দুই হাত তুলে নিজের মৃত্যু কামনা করত। চিন্তা করতে পারেন, কী নিদারুণ পরিস্থিতি?’, হাহাকার করে বলেন মাইসুন।

আর কয়েক ঘণ্টা পর মাগরিবের আজান শুনে রোজা ভাঙবেন মাইসুন ও তার পরিবারের সদস্যরা। গাজার ওই ছোটখাটো, দুর্বল তাঁবুর ভেতর ইফতারের থালা হাতে খানিকটা শান্তি ও স্বস্তির সময় কাটাবেন তারা।

বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের আশাবাদ, গত ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় চালু যুদ্ধবিরতি স্থায়ীভাবে সংঘাত থামাবে। আর মাইসুনের মতো হাজারো গাজাবাসীকে যেন কোনো রমজান এভাবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটাতে না হয়।