বাগানে হাঁটতে গিয়ে প্রাণে বেঁচে যান মোজতবা খামেনি

স্টার অনলাইন ডেস্ক

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে। প্রথম দিকের হামলার মূল লক্ষ্য ছিল দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কম্পাউন্ড। যেটা একইসঙ্গে তার আবাস ও কর্মস্থল। 

ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিমিষেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। 

তবে প্রাণে বেঁচে যান তার দ্বিতীয় ছেলে এবং দেশের বর্তমান নেতা মুজতবা খামেনি। 

কী ভাবে তীব্র হামলার মাঝেও প্রাণে বেঁচে গেলেন মুজতবা খামেনি, সেই শ্বাসরুদ্ধকর বয়ান উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে। 

গতকাল সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার কয়েক মিনিট আগে দৈবক্রমে ঘর থেকে বের হয়ে বাগানে হাঁটতে গিয়েছিলেন মুজতবা খামেনি। 

দ্য টেলিগ্রাফ একটি অডিও ফাইল সংগ্রহ করেছে, যেখানে এই ঘটনার বর্ণনা আছে। অডিওতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কার্যালয়ের প্রটোকল প্রধান মাজাহের হোসেইনি কথা বলেন। শ্রোতা ছিলেন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা ও বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডাররা। 

হামলার সময় সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডে ঠিক কি ঘটেছিল, সেটার বিস্তারিত বর্ণনা এই বক্তব্য থেকে জানা যায়। এতে বলা হয়, বাবার মতো সন্তান মোজতবাও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। 

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: রয়টার্স
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: রয়টার্স

 

দ্য টেলিগ্রাফ ওই ফাঁস হওয়া অডিও ফাইলটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করেছে। 

অডিওতে সাবেক সর্বোচ্চ নেতার প্রটোকল প্রধান মাজাহের হোসেইনি জানান, হামলা শুরুর ঠিক আগে ‘কিছু একটা করার জন্য’ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান মোজতবা খামেনি। 

তার কিছুক্ষণ পরই, স্থানীয় সময় সকাল ৯টা বেজে ৩২ মিনিটে ইসরায়েলের ‘ব্লু স্প্যারো’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তার বাড়িতে আঘাত হানে। 

হোসেইনি আরও জানান, সরাসরি হামলার শিকার না হলেও পায়ে আঘাত পান মোজতবা খামেনি। 

হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে তার স্ত্রী ও সন্তান নিহত হয়। তার শ্যালকের মাথা দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। 

হোসেইনি আরও জানান, খামেনির সামরিক ব্যুরোর প্রধান মোহাম্মদ সিরাজি এই হামলায় ‘ছিন্নভিন্ন হয়ে যান’। পরবর্তীতে তার মরদেহ শনাক্ত করার জন্য শুধু কয়েক কেজি মাংস অবশিষ্ট ছিল। 

খামেনির সামরিক ব্যুরোর প্রধান মোহাম্মদ সিরাজি। ছবি: সংগৃহীত
খামেনির সামরিক ব্যুরোর প্রধান মোহাম্মদ সিরাজি। ছবি: সংগৃহীত

 

১২ মার্চ তেহরানের কিয়োলহাক মহল্লায় হোসেইনির সঙ্গে ধর্মীয় নেতা ও আইআরজিসির কমান্ডারদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই এসব কথা বলেন জ্যেষ্ঠ খামেনির প্রটোকল প্রধান। 

ইরানের রাজধানীতে বাবার সঙ্গে একই কম্পাউন্ডে বসবাস করতেন মোজতবা। সেখানে আলি খামেনির অন্যান্য সন্তানদের বাড়ি ও বক্তব্য দেওয়ার জন্য বড় একটি হল আছে। 

২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনি ও জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সেখানে বৈঠকে বসেছিলেন। এসময় কম্পাউন্ডে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। 

হামলায় আলি খামেনির পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি নিহত হন আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপৌর ও ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ। 

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ।
ইরানের প্রয়াত প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ। ছবি: সংগৃহীত

 

হোসেইনি বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় মোজতবা কিছু একটা করার জন্য বাগানে গিয়েছিলেন এবং আবার ফিরে এসেছিলেন।’

‘যখন ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে, তিনি তখন বাইরে থেকে ফিরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিলেন। তার স্ত্রী হাদ্দাদ তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হয়’, যোগ করেন তিনি। 
মাজাহের হোসেইনি জানান, মোজতবা ‘পায়ে সামান্য আঘাত পেয়েছেন।’

অডিওর বর্ণনা মতে, একইসঙ্গে অফিস কমপ্লেক্সের একাধিক অবস্থানে হামলা চালায় ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এক ধাক্কায় পুরো খামেনি পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করা।

হোসেইনি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শয়তান’ আখ্যা দিয়ে জানান, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যেখানে ছিলেন, সে জায়গায় তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। 

ওপরের তলায় মোজতবার বাড়িতে হামলা হয়। পাশাপাশি, এর ঠিক নিচে মোজতবা খামেনির শ্যালক মিসবাহ আল-হুদা বাঘেরি কানি ও তার ভাই মোস্তাফার খামেনির বাড়িতেও হামলা হয়।  

‘ক্ষেপণাস্ত্রটি এতোটাই শক্তিশালী ছিল যে এর দমকে নিচের তলার একটি কক্ষে অবস্থানরত মিসবাহ’র মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে আসে’, যোগ করেন তিনি। 

 

মোস্তাফা খামেনি ও তার স্ত্রীর বাড়ি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অক্ষত অবস্থায় সেখান থেকে তারা বের হয়ে আসেন। 

প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেয় দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদ। 

তবে নিয়োগ পাওয়ার পর একবারও জনসম্মুখে আসেননি নতুন নেতা। এমন কী, সংঘাত শুরুর পর ১৮ দিন পেরিয়ে গেলেও খামেনির অন্যান্য সন্তানদের কাছ থেকেও কোনো বার্তা আসেনি। 

জনসম্মুখে না এসে একটি লিখিত বার্তা পাঠান মোজতবা খামেনি। 

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ওই বার্তা পড়ে শোনানো হয়। 

মোজতবা খামেনির এই প্রলম্বিত ও  রহস্যজনক ‘অনুপস্থিতি’ নানা জল্পনা কল্পনার জন্ম দেয়। 

এমন কী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মত দেন, ইরান যতটূকু স্বীকার করছে, তার চেয়েও মোজতবা খামেনির আঘাত গুরুতর। 

এমন সময় এই অডিও ফাঁস হলো যখন মোজতবা খামেনির আঘাতের ধরন ও তার নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। 

সোমবার ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জানি না তিনি বেঁচে আছেন না মারা গেছেন।’

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

 

ইরানের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, সামরিক কমান্ডারদের কাছে মুজতবা খামেনির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। 

মার্কিন গোয়েন্দাদের বিশ্লেষণ মতে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি চাননি মোজতবা খামেনি তার উত্তরসূরি হোক। তিনি তাকে ‘খুব বেশি প্রতিভাবান নয়’ এবং ‘নেতা হওয়ার অযোগ্য’ আখ্যা দেন।

তবে গোয়েন্দাদের এই দাবি সত্য হোক বা না হোক, অমোঘ সত্য এটাই যে মুজতবা খামেনিই এখন ইরানকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। 

তবে তিনি আদৌ সুস্থ আছেন কী না, সে প্রশ্নের জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।