যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় আসিম মুনিরের ভূমিকা কী ছিল?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিতে এসে শনিবার বিমান থেকে নামেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের ‘শক্তিশালী’ সেনাপ্রধান আসিম মুনির। সেখানে তিনি সাধারণ পোশাকে উপস্থিত ছিলেন এবং আশপাশের সবার সঙ্গে মিশেও গিয়েছিলেন।

এই দৃশ্যটি অনেক বিশেষজ্ঞের মতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রতিফলন। এই বৈঠকের নেপথ্যে তার ভূমিকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা এএফপি।

ইসলামাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামার চিমা এএফপিকে বলেন, ‘তিনি একজন সৈনিক, একজন রাষ্ট্রনায়ক এবং একজন কূটনীতিক। মুনির বৈশ্বিক পর্যায়ে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি বদলাতে একটি গতি তৈরি করেছেন।’

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আনতে পাকিস্তানের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছে এবং কিছুটা বিস্ময়ও তৈরি করেছে। এটি ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি বৈঠক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উভয় প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে ভ্যান্সের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ—সব মিলিয়ে ইসলামাবাদে মুনির পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।

ইরানের প্রতিনিধি দলকেও স্বাগত জানান আসিম মুনির। ১১ এপ্রিল ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

এই ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় মুখোমুখি আলোচনায় মুনির ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আলোচনা ‘মধ্যস্থতা’ করতে সহায়তা করেছেন বলে এএফপিকে জানিয়েছেন এক বেসামরিক কর্মকর্তা।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ওঠানামা থাকা একটি দেশের জন্য এটি দীর্ঘ পথচলার ফল। অতীতে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই ইসলামাবাদকে সমালোচনা করেছে, যদিও প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের সঙ্গে কাজও করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে উল্লেখ করেন। গত বছর পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে স্বল্প কিন্তু তীব্র সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার সময় তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়।

ওই সংঘাতের পর পাকিস্তান ট্রাম্পের প্রশংসা করে এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেন। তবে ভারত এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কম গুরুত্ব দিয়েছে।

এই সপ্তাহের শেষে দীর্ঘ আলোচনার পর ভ্যান্স ঘোষণা করেন, কোনো চুক্তি ছাড়াই তিনি ফিরে যাচ্ছেন। তবে পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা সংলাপ চালিয়ে যেতে সহায়তা করবে।

আলোচনা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘ফিল্ড মার্শাল মুনির নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুদ্ধের আগুন কমাতে এবং উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন।’

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন আসিম মুনির। ছবি: সংগৃহীত

‘সক্রিয় ভূমিকা’

বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্বে মুনিরের উত্থান পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতার ধারাবাহিক ইতিহাসের সঙ্গেও মিলেছে। তাকে নজিরবিহীন আইনি সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে সেনাবাহিনী শাসনব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে।

সমালোচক ও বিরোধীরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ এবং ব্যাপক সাংবিধানিক সংস্কার দেশের গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখন কারাগারে আছেন। তিনি আগে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করলেও পরে তাদের সমালোচনা করেন। তবে সেনাবাহিনী বারবার বলেছে, খানের মামলা বা বেসামরিক বিষয়ে তারা হস্তক্ষেপ করেনি।

আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো এবং ‘দ্য ব্যাটল ফর পাকিস্তান’ বইয়ের লেখক শুজা নওয়াজ বলেন, ‘এখন সেনাবাহিনীর অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থায় নজিরবিহীন প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।’

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে একাধিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রায় অর্ধেক সময় সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে ছিল।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে কথা বলছেন আসিম মুনির। ছবি: রয়টার্স

বেসামরিক বা সামরিক—উভয় শাসনেই পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর আগ্রহের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

বিদেশি কূটনীতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য রাজধানীর কাছে রাওয়ালপিন্ডিতে সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ সূচি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান মুনির ২০২২ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় কূটনৈতিক মহলে তার পরিচিতি তার পূর্বসূরি জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার তুলনায় কম ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে তা বদলেছে।

নওয়াজ বলেন, ‘ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তার পূর্বসূরিদের তুলনায় শাসন ও পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক বেশি সরাসরি ভূমিকা পালন করছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তানের পক্ষে সুসংগত যুক্তি তুলে ধরার সক্ষমতার মাধ্যমে তিনি বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রভাবশালী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।’ ইরান ও সৌদি আরবের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ট্রাম্পকে মুগ্ধ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গত জুনে ওয়াশিংটন সফরে শরিফের সঙ্গে মুনিরও ছিলেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

সেই বৈঠকের পর ট্রাম্প গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তারা ইরানকে খুব ভালোভাবে বোঝে—অনেকের চেয়েও ভালো,’ যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি ইরান ও ইসরায়েল বিষয়ে মুনিরের পরামর্শ নিয়েছেন কি না।

পাকিস্তানি-আমেরিকান লেখক হাসান আব্বাস বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা এবং পরে ওয়াশিংটনে তার তৎপরতার কারণে মুনিরের কূটনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে তার ছবি ও মধ্যাহ্নভোজের বৈঠকই তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি বদলে দিয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলকে বিমানবন্দরে বিদায় জানাতেও আসেন মুনির। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল পাকিস্তান ছাড়ার সময় আবারও মুনির বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তি না হলেও, উভয় পক্ষই তাদের আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে—বিশেষ করে ফিল্ড মার্শাল মুনিরের প্রতি।