মার্কিনিরা কি ট্রাম্পের মতো নেতাই চান?
দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত—এই প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট র্নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প তুলনামূলক সংযত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কথা বললেও, তার দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে। পররাষ্ট্র বিষয়ক গবেষণা সংস্থাগুলোর ভাষ্য, এই প্রবণতা আগের তুলনায় বেশি জবরদস্তিমূলক, লেনদেনভিত্তিক ও একতরফা।
তবে এই বিতর্কের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—মার্কিন নাগরিকরা নিজের দেশের বৈশ্বিক ভূমিকাকে কীভাবে দেখেন এবং তারা আসলে কী ধরনের পররাষ্ট্রনীতি চান।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর) ২০২৫ সালের শেষদিকে ২৯টি অঙ্গরাজ্যের ৩৩২ জন সাধারণ মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কথা বলে। অ্যারিজোনা, জর্জিয়া ও মিশিগান—এই তিন রাজ্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীরা আটলান্টা, ডেট্রয়েট, ফিনিক্স ও ওয়াশিংটন ডিসিতে সরাসরি এবং অনলাইনে এসব আলোচনায় যুক্ত হন। এই আলোচনা ও বিভিন্ন জরিপের তথ্য দিয়ে মূল প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে যতটা বিভাজন দেখা যায়, সাধারণ মানুষের মধ্যে ততটা নয়। বরং একটি স্পষ্ট প্রবণতা রয়েছে—মার্কিনিরা চায় তাদের দেশ বিশ্বমঞ্চে সক্রিয় থাকুক এবং নেতৃত্ব দিক। তবে সেই ভূমিকার সুফল যেন সরাসরি তাদের জীবন ও জাতীয়তায় প্রতিফলিত হয়।
সক্রিয়তা চাই, তবে যুদ্ধ নয়
আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা সাধারণভাবে মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বে সক্রিয় ও প্রভাবশালী হওয়া উচিত। তবে বিদেশের মাটিতে অপ্রয়োজনীয় সামরিক সংঘাতে জড়ানো উচিত নয়। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র যদি পিছু হটে, তাহলে চীনসহ অন্যান্য স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির প্রভাব বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
একইসঙ্গে তারা বলেছেন, বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার বাস্তব সুফল সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে—বিশেষ করে নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব। বন্দরনির্ভর শ্রমিক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ী বা রপ্তানিমুখী কৃষকদের জীবনে পররাষ্ট্রনীতির সরাসরি প্রভাব পড়ে—এ কথাও আলোচনায় উঠে এসেছে।
নীতিনিষ্ঠ বিনয়ী কূটনীতি
মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির প্রতিও সমর্থন রয়েছে মার্কিন নাগরিকদের। আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মতো নীতিকে সামনে রেখে কূটনীতি পরিচালনার পক্ষে অনেকেই মত দিয়েছেন।
তবে একইসঙ্গে ‘আমেরিকান ব্যতিক্রমবাদ’—অর্থাৎ অন্য দেশের ওপর নিজেদের মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়ার ধারণা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। বিশেষ করে তরুণরা যুক্তরাষ্ট্রের অতীত সামরিক হস্তক্ষেপের ব্যর্থতা, গাজায় ইসরায়েলকে সমর্থন এবং নিজ দেশের গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অন্য দেশকে নির্দেশনা দেওয়ার নীতির বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, এমন আচরণ অনেক দেশের কাছে অহংকার বা কপটতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা জরুরি
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বাণিজ্যের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীই একমত যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মার্কিন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একইসঙ্গে শুল্ক বৃদ্ধির ফলে পণ্যের দাম বাড়া এবং বাণিজ্যের সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে না পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে শিল্পনির্ভর অঞ্চলে এই আশঙ্কা বেশি।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতির কারণে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার সমালোচনা করে অংশগ্রহণকারীরা এমন একটি বাণিজ্য কাঠামোর কথা বলেছেন, যা পূর্বানুমানযোগ্য এবং ব্যবসা ও শ্রমবাজারের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও অনেকেই বৈশ্বিক সহযোগিতার পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখছেন।
দেশেই শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি গড়া
আলোচনায় আরেকটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি গড়ে ওঠে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর। রাজনৈতিক মেরুকরণ, গণতান্ত্রিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন অংশগ্রহণকারীরা।
তাদের মতে, শিক্ষার মানোন্নয়ন, বৈষম্য হ্রাস এবং জাতীয় ঐক্য জোরদার না হলে আন্তর্জাতিক পরিসরে কার্যকর ভূমিকা রাখা কঠিন হবে। অর্থনৈতিকভাবে মানুষ স্বস্তিতে থাকলে তবেই তারা বৈশ্বিক সম্পৃক্ততাকে বেশি সমর্থন করে—এমন ধারণাও উঠে এসেছে।
জরিপ যা বলছে
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোও এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখায়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শিকাগো কাউন্সিলের এক জরিপে প্রতি ১০ জনের ৬ জন আমেরিকান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত।
এনপিআর/ইপসোসের জরিপে ১০ জনের মধ্যে ৬ জন উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের নৈতিক নেতা হিসেবে দেখতে চান। যদিও ১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন মনে করেন—দেশটি বর্তমানে সেই অবস্থানে রয়েছে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে রকফেলার ফাউন্ডেশনের জরিপে ৬১ শতাংশ মানুষ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে মত দেন।
মিত্রতার বিষয়টিও ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। শিকাগো কাউন্সিলের জরিপে ১০ জনের ৯ জন অংশগ্রহণকারী বলেছেন, জোট গঠন পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পক্ষেও উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে, যদিও একইসঙ্গে অনেকেই দেশীয় কর্মসংস্থান রক্ষায় আমদানি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত দিয়েছেন।
সমর্থন আছে, তবে নিঃশর্ত নয়
তবে এই সমর্থন নিঃশর্ত নয়। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছর পূর্তির সময়কার জরিপগুলোতে দেখা গেছে, অনেক আমেরিকান বর্তমান নীতিকে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক বলে মনে করছেন।
এপি-নর্ক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন, যা কয়েক মাস আগেও ছিল ৩৩ শতাংশ। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের বিরুদ্ধেও জনমতের অনীহা একই প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
সামনে পথ যেদিকে
জনমত সরাসরি পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে না এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বই জনমতকে প্রভাবিত করে। তবুও একটি বিষয় পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, মার্কিনিরা বৈশ্বিক নেতৃত্বের পক্ষে থাকলেও তারা চান সেই নেতৃত্ব হোক সংযত, বাস্তবমুখী এবং দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।