নিউইয়র্কে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে হাফ চিকেন!

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও ঝলসানো মুরগী বা গ্রিল চিকেন বেশ জনপ্রিয় খাবার। তবে মার্কিন মুলুকে এই খাবারের রেসিপি কিছুটা ভিন্ন। 

সেখানে রেস্টুরেন্টগুলোতে ‘রোটিসেরি চিকেন’ অর্ডার করলে গ্রিল চিকেনের মতোই একটি সুস্বাদু খাবার আপনাকে পরিবেশন করা হবে। 

সেই রোটিসেরি চিকেন নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নিউইয়র্কের এক দোকানে ৪০ ডলারে বিকোচ্ছে হাফ-চিকেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকার সমান। 

আজ মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে। 

যেখানে পাবেন ৪০ ডলারের মুরগি 

ব্রুকলিনের বিলাসবহুল এলাকায় জিজি’স নামের ফরাসি রেস্টুরেন্টটির মালিক হিউগো হাইভারন্যাট। 

কার্যক্রম শুরুর অল্প দিনের মধ্যেই বিতর্কিত হয়েছে দোকানটি। 

কেউ বলছেন, বাইরে খেতে যাওয়ার ব্যাপারটা প্রকৃত অর্থেই ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। কেউ বলছেন, ভালো খাবারের উৎস হিসেবে নিউইয়র্কের সুনামের অপব্যবহার করছেন নব্য রেস্তোরাঁ মালিকরা। 

তবে এ ব্যাপারে ভিন্নমত দেন হাইভারন্যাট। 

রেস্তোরাঁ মালিক হিউগো হাইভারন্যাট। ছবি: সংগৃহীত
রেস্তোরাঁ মালিক হিউগো হাইভারন্যাট। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, ‘খাবারের দাম জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি’।  

‘অনেকে ভাবছেন আমরা ৪০ ডলারে মুরগি বিক্রি করে আমরা বড়লোক হয়ে যাচ্ছি। অর্জিত লাভের টাকায় সাপ্তাহিক ছুটিতে পোর্শে গাড়ি হাঁকিয়ে হ্যাম্পটনস-এ বেড়াতে যাই। কিন্তু আমাদের অবস্থাও এখানকার অন্য সব বাসিন্দার মতোই’ , যোগ করেন তিনি। 

উল্লেখ্য, নিউইয়র্কের একটি বিলাসবহুল বিচ রিসোর্টের নাম হ্যাম্পটন্স। 

হাইভারন্যাটের দাবি, মূল্যস্ফীতির কবলে পড়েছে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। যার ফলে দোকানের কার্যক্রম পরিচালনার খরচ ও পাইকারি বাজারে খাবারের দাম বেড়েছে। 

হাইভারন্যাট বলেন, ‘রেস্টুরেন্টে খাবারের দাম কেমন রাখা উচিৎ, সে বিষয়ে অনেকে খুব ভালো ধারণা রাখেন। কিন্তু ওই খাবার বানাতে কত খরচ পড়ে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই।’

৩৬ বছর বয়সী হাইভারন্যাট প্যারিস ও নিউইয়র্কের সুপ্রসিদ্ধ ফালগার‍্যানসেস রেস্টুরেন্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। একই মূল প্রতিষ্ঠানের অধীনেই জিজিস চালু করেন তিনি। 

তিনি ব্যাখ্যা দেন, ৪০ ডলারের মধ্যে ২৫ শতাংশই খাবারের উপকরণ জোগাড় করতে খরচ হয়, যার মধ্যে আছে নিউইয়র্কের আপস্টেট থেকে আনা উচ্চ মানের মুরগি। বাকিটা যায় ভাড়া, বিভিন্ন পরিষেবার বিল, কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য খরচে। 

বাকি সামান্য যতটুকু মুনাফা থাকে, সেটা দিয়ে পাঁচ লাখ ডলারের ঋণ পরিশোধ করছেন বলে দাবি করেন হাইভারন্যাট। রেস্টুরেন্ট চালু করার সময় ব্যাংক থেকে ওই পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।  

যে ভাবে আলোচনায় এলো ৪০ ডলারের মুরগি 

ব্রুকলিনের এক স্থানীয় আইনপ্রণেতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে ৪০ ডলারের মুরগি নিয়ে আপত্তি জানান। তার সেই পোস্টে নয় হাজারেরও বেশি লাইক পড়ে। 

এর প্রেক্ষাপটে অপর একটি রেস্টুরেন্ট ‘হাফ চিকেন মূল্য সূচক’ নামের একটি তালিকা প্রকাশ করেন, যেখানে ম্যানহাটনের একটি ফরাসি রেস্তোরাঁর ৭৮ ডলারের হাফ চিকেন থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ১০ ডলারের হাফ চিকেনের বিস্তারিত জানানো হয়। 

বেশিরভাগ মানুষ রেস্তোরাঁয় খাবারের উচ্চ মূল্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও অনেকে জিজি’স-এর পক্ষেও সাফাই গেয়েছেন। তারা যুক্তি দেন, ছোট ব্যবসায়ীরা চরম তহবিল সংকটে ভুগছেন। 

নিউ ইয়র্ক সিটি হসপিট্যালিটি অ্যালায়েন্স নামের সংস্থার নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু রিজি এএফপিকে বলেন, ‘অনেকে রেস্তোরাঁ মুনাফার দেখা পাচ্ছে না। তারা কোনো মতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি এর পেছনে কারণ হিসেবে বিমার কিস্তি, কোভিড মহামারি পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতির এখনো ঘুরে দাঁড়াতে না পারা এবং ‘ট্রাম্প শুল্কের’ কারণে খাবারের দাম বেড়ে যাওয়াকে দায় দেন।  

রিজি বলেন, অবধারিতভাবেই, রেস্তোরাঁর মূল্য তালিকায় এ বিষয়গুলোর প্রতিফলন পড়েছে। 

নিউইয়র্ক সিটি হসপিটালিটি অ্যালায়েন্স ২০০ রেস্তোরাঁর ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। সেখানে দেখা যায় ৪৬ শতাংশ দোকান ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে প্রত্যাশার চেয়ে কম ব্যবসা করেছে। 

রেস্তোরাঁগুলো সমস্যা হিসেবে কর্মীদের মজুরি, খাবার ও সেবার দাম এবং ভোক্তার সংখ্যা কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে। 

জিজিস-এর হেড শেফ টমাস নডেল জানান, তিনি এই বিতর্ককে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। 

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় সব কিছুরই দাম বেড়েছে। এজন্য মানুষ এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অন্তত মানুষ তাদের হতাশার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছে—এটাকেই ইতিবাচক ভাবে দেখেন তিনি। 

‘আমরা স্বীকার করছি। ৪০ ডলারের হাফ চিকেন ব্যয়বহুল। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বাস্তবতার মাঝেই আমরা এখন বাস করছি’, যোগ করেন নডেল। 

নডেল (৩৫) মনে করেন, নীতিমালায় পরিবর্তন আনা উচিৎ। পাইকারি বিক্রেতাদের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়াসহ আরও কিছু পদক্ষেপ খুবই জরুরি। 
‘আলোচনা শুরু হয়েছে, যা ইতিবাচক। কারণ, এভাবেই পরিবর্তন আসে’, বলেন তিনি। 

সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে উদ্বেগ আশংকায় আছেন মার্কিনিরা। নিউইয়র্কের বাসিন্দারা এর অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। 

নিউইয়র্কের নব নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম ছিল এ ধরনের খরচ কমিয়ে আনা। 

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। ছবি: রয়টার্স
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। ছবি: রয়টার্স

অনেকে বলেন, এই প্রতিশ্রুতিই তাকে মেয়র পদে জিতিয়েছে। তবে শপথে নেওয়ার পর প্রায় চার মাস সময় চলে গেলেও এখনো এ বিষয়ে তেমন সাফল্য অর্জন করতে পারেননি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র মামদানি। 

২০২৩ সালের আগে ১০ বছরে নিউইয়র্কে রেস্তোরাঁর মেনুতে খাবারের দাম ৪৩ দশমিক ছয় শতাংশ বেড়েছে। একই সময়কালে সার্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে খাবারের দাম বেড়েছে ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ।