লিমন-বৃষ্টি হত্যা

চ্যাটজিপিটির কাছে কী জানতে চেয়েছিলেন হিশাম, যেভাবে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো ‘চ্যাট হিস্ট্রি’

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি হত্যার ঘটনার তদন্তে গ্রেপ্তার হিশাম আবুগারবিয়েহর সঙ্গে চ্যাটজিপিটির কথোপকথনকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

মামলার প্রসিকিউটরদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে এআই চ্যাটবটের কাছে লাশ গুম এবং প্রমাণ লোপাটের নানা উপায় জানতে চেয়েছিলেন নিহত লিমনের সাবেক রুমমেট হিশাম। এটি এখন এই জোড়া খুনের মামলায় অন্যতম প্রধান তথ্য-প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

আজ শনিবার সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে উঠে আসে কীভাবে তদন্তের সময় পুলিশ অভিযুক্তের সঙ্গে এআইয়ের কথোপকথনকে শক্ত প্রমাণ হিসেবে হাজির করেছে।

হিশাম
চ্যাটজিপিটির সঙ্গে হিশামের কথোপকথন। ছবি: স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

তদন্তে হত্যা সংক্রান্ত প্রথম কথোপকথনটি পাওয়া যায় ১৩ এপ্রিলের। এর ১০ দিন পর ২৩ এপ্রিল ফ্লোরিডার হিলসবরোর একটি ডাস্টবিন থেকে রক্তমাখা কালো কুশন ফ্লোর ম্যাট, মানিব্যাগ, চশমা ও রক্তমাখা পোশাক উদ্ধার করে পুলিশ।

এর একদিন পর হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছে একটি কালো ময়লার ব্যাগে মানবদেহের অংশ পাওয়া যায়। যা পরে লিমনের বলে শনাক্ত করা হয়।

সেদিনই অন্য একটি ঘটনায় ফ্লোরিডা থেকে আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তদন্তে জানা যায়, জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি হত্যার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

 

তদন্তের বরাতে সিএনএন জানায়, হত্যার আগে ও পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবট ‘চ্যাটজিপিটি’র কাছে লাশ গুম ও অপরাধ গোপনের নানা উপায় জানতে চেয়েছিলেন হিশাম আবুগারবিয়েহ।

চ্যাটজিপিটি সার্চ

গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী লিমন ও বৃষ্টি।

আদালতে তদন্তকারীদের দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন আগ থেকেই আবুগারবিয়েহ চ্যাটজিপিটিকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করেন।

আদালতে উপস্থাপন করা এমন কথোপকথনের কয়েকটি নিচে দেওয়া হলো:

১৩ এপ্রিল (হত্যার আগে)

সেদিন আবুগারবিয়েহ চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেন, ‘যদি কোনো মানুষকে কালো আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয় তবে কী হবে?’

জবাব আসে, এটি খুবই বিপজ্জনক হবে।  

এমন উত্তর পাওয়ার পর প্রশ্নকর্তা আবার জানতে চান, ‘তারা (কর্তৃপক্ষ) কীভাবে এটি খুঁজে পাবে?’

প্রশ্ন: লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে বন্দুক রাখা আইনত বৈধ কি না?

প্রশ্ন: গাড়ির ভিআইএন বা ভিকেল আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার পরিবর্তন করা যায় কি না?

১৯ এপ্রিল (হত্যার পর)

প্রশ্ন: মাথায় স্নাইপারের গুলি লাগার পরও কেউ কি বেঁচে গেছে?

প্রশ্ন: আমার বন্দুকের আওয়াজ কি প্রতিবেশীরা শুনতে পাবে?

প্রশ্ন: কত তাপমাত্রায় পানি তাৎক্ষণিকভাবে শরীর জ্বালিয়ে দিতে পারে?

২৩ এপ্রিল

প্রশ্ন: নিখোঁজ বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক বলতে কী বোঝায়?

তদন্তে ‘চ্যাট হিস্ট্রি’

মামলার তদন্তকারীরা বলছেন, এই চ্যাট লগগুলো শুধু তথ্য নয় বরং হত্যাকারীর মানসিক অবস্থা এবং উদ্দেশ্য বোঝার জন্য প্রমাণের ‘ভাণ্ডার’।

ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট অনুযায়ী বাস্তবে লিমনের মরদেহ একটি আবর্জনার ব্যাগেই পাওয়া যায়। চ্যাটজিপিটির কাছে করা প্রশ্ন থেকে জানা যায়, হত্যা ও মরদেহ লুকানোর জন্য আগেই অনলাইন থেকে কেনাকাটাও করেন আবুগারবিয়েহর।

মামলার নথিতে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের আগের সপ্তাহে অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ, ময়লার ব্যাগ, লাইটারের জ্বালানি, ফায়ার স্টার্টার ও কাঠকয়লা অর্ডার করেছিলেন আবুগারবিয়েহর। অ্যামাজন থেকে নকল দাড়িও কেনেন তিনি।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করা জিনিসপত্র পরীক্ষা করে লিমন ও বৃষ্টির রক্তের চিহ্ন পাওয়া যায়।

একইসঙ্গে আবুগারবিয়েহের অ্যাপার্টমেন্টে পরীক্ষা চালিয়ে দরজা থেকে শোয়ার ঘর পর্যন্ত রক্তের দাগ পাওয়া গেছে, যা হত্যাকারীর চ্যাটজিপিটি কথোপকথনের সঙ্গে মিলে যায়। অর্থাৎ, তিনি সত্যিই মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার কৌশল খুঁজছিলেন।

আদালতে ‘চ্যাট হিস্ট্রি’

আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে দুজনকে হত্যার অভিযোগের পর আদালতে দাখিল করা নথিতে চ্যাটজিপিটির এসব  কথোপকথন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অপরাধ তদন্তে চ্যাট হিস্ট্রিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ এটাই প্রথম নয়। লস অ্যাঞ্জেলেসে অগ্নিসংযোগের একটি মামলার বিচারে চ্যাটজিপিটির কথোপকথনের উল্লেখ করা হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালে ভার্জিনিয়ার একটি হত্যা মামলার বিচারে স্ন্যাপচ্যাট এআইয়ের কথোপকথন ছিল অন্যতম রুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

আইনজীবীরা মনে করেন, এ ধরনের ইলেকট্রনিক প্রমাণ ব্যক্তির উদ্দেশ্য, কর্মকাণ্ড ও মানসিক অবস্থা প্রকাশ করে দিতে পারে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে গত বছরের একটি হত্যার মামলার উদাহরণের উল্লেখ করেন আইনজীবীরা। ওই মামলায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চ্যাটজিপিটির কাছে মরদেহ সৎকারের উপায়, মরদেহ না পাওয়া গেলে হত্যা মামলা দেওয়া সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নগুলোকে প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়েছিল আদালতে।

বোস্টনে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বরফের মধ্যে মৃত অবস্থায় পাওয়া যাওয়ার ঘটনা তদন্তে এক সাক্ষীর গুগল সার্চের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ওই সাক্ষী গুগলে সার্চ করেছিলেন, ঠাণ্ডায় মারা যেতে কত সময় লাগে।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী ইলিয়া কোলোচেঙ্কো সিএননকে বলেন, ‘সন্দেহভাজনরা মনে করে এআইয়ের সঙ্গে তাদের কথোপকথন গোপন থাকবে, তাই তারা খুব সরাসরি প্রশ্ন করে ফেলে। যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য তথ্যের ভাণ্ডার হয়ে দাঁড়ায়।’

টেক্সাস-ভিত্তিক আইনজীবী ভার্জিনিয়া হ্যামারলে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানে আমরা বিষয়টিকে এভাবে দেখছি যে, কেউ চ্যাটজিপিটিতে যা কিছুই টাইপ করুক না কেন, তা প্রকাশযোগ্য হতে পারে।’

আর আইন বিশ্লেষক জোয়ি জ্যাকসনের মতে, ‘এআই চ্যাটবটের তথ্য ফোন কল লগের মতোই প্রামাণ্য দলিল হিসেবে এখন গণ্য হচ্ছে।’

ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান জানিয়েছেন, চ্যাটজিপিটির সঙ্গে স্পর্শকাতর আলাপগুলো ডাক্তার বা আইনজীবীদের মতো ‘লিগ্যাল প্রিভিলেজ’ বা আইনি সুরক্ষা পায় না। ফলে আদালতের নির্দেশে এই ডেটা সরবরাহ করতে কোম্পানি বাধ্য থাকে।

লিমন-বৃষ্টি হত্যার বিচারকাজের বর্তমান অবস্থা

জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি হত্যার ঘটনায় আদালতে দাখিল করা নথিতে বলা হয়েছে, একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয় লিমনকে। ময়নাতদন্তে জানা যায়, লিমনের পিঠে গভীর ছুরিকাঘাত লিভার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।

বৃষ্টিকেও একইভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা তদন্তকারীদের।

আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে হত্যা ছাড়াও মরদেহ গোপন করা, মৃত্যুৎ তথ্য গোপন রাখা, তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করা, অবৈধভাবে আটকে রাখা ও হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দোষ স্বীকার করেননি আসামি। তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে। প্রসিকিউটররা বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখার আবেদন জানিয়েছেন।

আবেদনে বলা হয়েছে, অপরাধের নৃশংসতা ও সহিংসতা প্রমাণ করে যে তাকে মুক্তি দিলে সমাজের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।