এক্সপ্লেইনার

শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন কী ইসরায়েলের ভাবমূর্তি বদলাবে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘ সময় ধরেই প্রক্রিয়াটি চলছে। বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো ধীরে ধীরে ইসরায়েলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বড় ব্যতিক্রম যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে পূর্বসূরিদের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিতে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। তেল আবিবের দৃষ্টিতে ইরান ‘পুরনো শত্রু’ হলেও ট্রাম্পের আগে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট দেশটিতে সরাসরি হামলার উদ্যোগ নেননি। 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হামলা চালিয়ে নতুন নজির তৈরি করেছে ওয়াশিংটন। 

তবে ওয়াশিংটনের অকুণ্ঠ সমর্থন পেলেও, ইসরায়েলের ক্ষেত্রে একটি বিষয় দিনের আলোর মতো স্পষ্ট—দিনে দিনে দেশটি একঘরে হয়ে পড়ছে। ব্রাত্য হচ্ছে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কাছে। 

গাজা, ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আগ্রাসী-সহিংস মনোভাবই এর মূল কারণ। 

২০২৫ সালে পিউ রিসার্চের এক জরিপে জানা যায়, ৫৯ শতাংশ ইসরায়েলির মত, বিশ্ববাসীর কাছে সম্মান হারিয়েছে তাদের দেশ। মাত্র ৩৯ শতাংশ মনে করেন এখনো সম্মানের লেশমাত্র টিকে আছে। 

অর্থাৎ, দেশটির সাধারণ জনগণ ইসরায়েলের এই ভাবমূর্তিতে সন্তুষ্ট নয়। নিজ দেশকে ইতিবাচকতার আলোয় দেখতে চান তারা। এই মনোভাবেরই ফায়দা নিতে চাইছেন দুই সাবেক প্রধান। 

নেতানিয়াহুকে বিদায় করার উদ্যোগ 

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর হাতে তৈরি নেতিবাচক ভাবমূর্তি বদলাতে চান ইসরায়েলের দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে রদবদল এনেই এটা করতে চান তারা। 

বিরোধী দলের নেতা নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদ একাট্টা হয়েছেন। তাদের উদ্দেশ্য, নেতানিয়াহুকে নির্বাচনে পরাজিত করে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠন করা। 


তবে মজার বিষয় হলো, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সমালোচনায় ফেটে পড়লেও, তার যুদ্ধ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোতে খুব একটা দ্বিমত নেই এই দুই সাবেক নেতার।

যার ফলে, বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, নাফতালি-লাপিদের টুগেদার পার্টি ও নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি আদতে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ ছাড়া আর কিছুই নয়। 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে নেতানিয়াহুর নির্দেশে-নেতৃত্বে নিরীহ গাজাবাসীদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এ মুহূর্তে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ চললেও প্রায় প্রতিদিনই ওই অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর খবর আসে। মোট ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন ওই সংঘাতে। 

এই গণহত্যার কারণে বিশ্ববাসীর সামনে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে। 

তবে বেনেট ও লাপিদ দাবি করেছেন, তারা নির্বাচনে জিতলে ইসরায়েলকে এই ব্রাত্য পরিস্থিতি থেকে বের করে নিয়ে আসবেন। 

ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী, আগামী অক্টোবরের মধ্যে দেশের সাধারণ নির্বাচন শুরু হতে হবে।  

এপ্রিলে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিবিদ নাফতালি বেনেট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে ঘোষণা দেন। 

তিনি ভোটারদের ‘সংস্কারের যুগ’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ওই যুগে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন পেশাদারী মানুষেরা, যাদের একমাত্র কাজ হবে ইসরায়েলের মঙ্গল হয়, এমন উদ্যোগ নেওয়া। নেতানিয়াহুর আমলে দেশের মানুষ যেভাবে বিভাজিত হয়েছে এবং যে ভাবে দেশটিকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে একঘরে করে রাখা হয়েছে, তা বদলানোর স্বপ্ন দেখিয়েছেন এই নেতা।  

ব্রাত্য ‘ইসরায়েল’ 

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের ভাবমূর্তি এখন অত্যন্ত নেতিবাচক। একঘরে হয়ে পড়েছে দেশটি। সাম্প্রতিক সময়ে এর চেয়ে খারাপ অবস্থায় যায়নি নেতানিয়াহুর দেশের জনপ্রিয়তা।  
এর পেছনে আছে একাধিক কারণ। 

জাতিসংঘের তদন্তে প্রমাণ হয়েছে, গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইউরোপে স্পেন, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের সমালোচনায় মুখর হয়েছে। 
অপরদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা বাতিলের অভ্যন্তরীণ চাপে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। 

এমন কী, ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও বারবার ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও নিজ দেশের ওপর তেল আবিবের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একাধিক জনমত জরিপে তা স্পষ্ট হয়েছে। 

রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের সমর্থকের মাঝেই ইসরায়েল প্রসঙ্গে রাগ, ক্ষোভ ও বিরক্তির বিষয়গুলো স্পষ্ট হচ্ছে। 

যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এ বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বিশ্বের শান্তিকামী জনতা।   

নেতানিয়াহু নিজে এ বিষয়টি নিয়ে হাসি ঠাট্টা করলেও বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে, তারা এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে সম্মান জানাবে। তাদের দেশে পা রাখলেই গ্রেপ্তার হবেন নেতানিয়াহু। 

এমন কী, খোদ নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিও একই কথা বলেছেন। নিউইয়র্কে এলেই গ্রেপ্তার হবেন ইসরায়েলি নেতা। 

ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা ‘তলানিতে’ 

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশানস (ইসিএফআর) নামের সংগঠনের পলিসি ফেলো বেথ ওপেনহাইম কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েল এখন একঘরে হয়ে যাচ্ছে।’

এ বিষয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জনমত জরিপের উদাহরণ দেন। 

‘আপাতত ট্রাম্প-নেতানিয়াহু জনসম্মুখে একে অপরকে বন্ধু আখ্যা দিয়ে চলছেন। তবে ইতোমধ্যে ইরান ও লেবানন যুদ্ধ প্রসঙ্গে দুইজনের মধ্যে বিভেদ স্পষ্ট হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলের জন্য অপমানজনক কয়েকটি পোস্ট করেছেন ট্রুথ সোশালে’, যোগ করেন তিনি।  

ইউরোপেও ইসরায়েল গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট প্রসঙ্গ নিয়ে সহানুভূতি ও অস্ত্র ও অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ থেকে এখনো ইউরোপের দেশগুলো সমন্বিত আকারে তেল আবিবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এমনই মত দেন বেথ ওপেনহাইম। 

সরকার বদলালেই বদলাবে ভাবমূর্তি? 

বিশ্লেষকদের মত, সরকার বদলালেও ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শত্রুভাবাপন্ন দেশের প্রতি ইসরায়েলের নীতিতে আমূল পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই বলেই চলে। 

নেতানিয়াহুর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বেনেট-লাপিদ এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন। 

তবে সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ও নিউইয়র্কের কনসাল জেনারেল অ্যালন পিনকাস এক অভিনব তত্ত্ব হাজির করেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা (লাপিদ-বেনেট) ধরে নিয়েছেন, গোটা বিশ্বের মানুষ মূলত নেতানিয়াহুকেই ঘৃণা করে—ইসরায়েলকে নয়’। 

‘তবে তারা যদি ক্ষমতায় আসেন, তাহলে তাদেরকে ভিন্ন ভাবে বিচার করবে মানুষ’, যোগ করেন তিনি। 

তিনি জানান, নেতানিয়াহুর তুলনায় নতুন নেতারা কতটা ভালো না খারাপ, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং দুই সরকারের মধ্যে নীতিগত দিক দিয়ে কেমন ব্যবধান থাকবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। 
পিনকাস বলেন, ‘তারা দুইজন একবারও লেবানন, হরমুজ প্রণালি, এমন কী, ইরান নিয়েও ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিচেল বারাক আল জাজিরাকে বলেন, ‘বেনেট ট্রাম্পকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে চাইবেন’। 

‘এ মুহূর্তে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় প্রভাব বজায় রেখেছেন। তবে আমরা জানি, ট্রাম্প বেশ খামখেয়ালি একজন মানুষ। যদি এমন হয় যে নেতানিয়াহু হেরে যাচ্ছেন, তাহলে ট্রাম্প তার সঙ্গ ত্যাগ করতে পারেন। পরাজিত মানুষদের ট্রাম্প একেবারেই পছন্দ করেন না’, যোগ করেন তিনি। 

ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে না পেরে পস্তাচ্ছে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশ। এমনটাই ভাবছেন বিশ্লেষক বেথ ওপেনহাইম। এ কারণে, নেতানিয়াহু সরে গেলে আবারও নতুন করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইবে অনেকেই। 

তিনি জানান, পশ্চিমা সরকারগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের জোগাড় করা তথ্য, তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও নজরদারি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল। 

তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। তা সত্ত্বেও, বেশিরভাগ সরকার আশা করছে, তাদেরকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের “পদক্ষেপ” নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। একটি নতুন সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সুবর্ণ সুযোগ হয়ে আসতে পারে।’

ওপেনহাইম বলেন, ‘একটি অপেক্ষাকৃত কম যুদ্ধংদেহী ইসরায়েলি প্রশাসন পশ্চিমা সরকারকে সম্পর্ক “রিসেট” করার টিকিট এনে দিতে পারে।’

তবে সরকারী নীতি না বদলালে দীর্ঘ মেয়াদে আবারও একই চক্র ঘুরেফিরে বারবার আসতে থাকবে, জানান তিনি।