সোমালিয়ায় মার্কিন ড্রোন হামলায় কেন লক্ষ্যবস্তু হলো শিশুরা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ছয় মাস আগে সোমালিয়ায় একটি মার্কিন ড্রোন হামলায় আট শিশুসহ অন্তত ১২ জন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র হামলার সত্যতা জানালেও এখন পর্যন্ত বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার কথা স্বীকার করেনি। এমনকি কোনো তদন্তও শুরু করেনি।

আজ মঙ্গলবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ওই হামলার তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর সকালে সোমালিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ছোট শহর জামামে তখন অনেকেই নাস্তা করছিলেন। ঠিক তখনই শোনা গেল ড্রোনের শব্দ। খাওয়া থামিয়ে কেউ কেউ জানালা দিয়ে বাইরে দেখতে লাগলেন।

সকাল ৯টার কিছু পরেই একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল পুরো জামামে শহর।

সেদিন নিজের ভূট্টা খেতে তার বাবা মোহাম্মদের সঙ্গে কাজ করছিলেন কৃষক আবদুল্লাহি মোহাম্মদ আবো শেখ আলি। সে সময় খবর পান, তাদের বাড়িতে হামলা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই ছুটে যান ঘটনাস্থলে।

সেই দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে মোহাম্মদ গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘চারপাশে জামাকাপড় আর বইখাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল।  কিন্তু সেদিকে তাকানোর মতো মানসিক অবস্থা আমার ছিল না। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমার নাতি-নাতনিদের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের সামনে।’

তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তার গর্ভবতী পুত্রবধূ সাফিয়ো হাসান আবুকারের মরদেহ দেখতে পান। পাশেই পড়ে ছিল সাফিয়োর বড় ছেলে ১০ বছর বয়সী আবদিফাতাহর দেহ।

ওই হামলায় নিহত হয় মোহাম্মদের আরও তিন নাতি। তারা হলেন, সাত বছর বয়সী আবদিনাসির, ছয় বছর বয়সী হুসেইন ও চার বছরের আবদুর রহমান।

গার্ডিয়ান জানায়, সেদিনের হামলায় মোহাম্মদের পরিবার ছাড়াও আরও অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে।

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান অনুযায়ী, হামলায় নিহত ১২ জনের মধ্যে আটটি শিশু রয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ছবি, ভিডিও ফুটেজ, শিশুদের শরীরে বিঁধে থাকা স্প্লিন্টারের এক্স-রে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে গার্ডিয়ান জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের যেকোনো মেয়াদে সোমালিয়ায় বেসামরিক নাগরিক নিহতের দিক থেকে এটিই সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ মার্কিন সামরিক অভিযান।

পূর্ব আফ্রিকার এই দেশটিতে গত ১৮ বছরের মধ্যে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে একসঙ্গে হত্যার কোনো রেকর্ড নেই।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য

স্থানীয় বাসিন্দা মারিয়ান হাজি আবদি গুলেদ গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘সেদিন আমার তিন সন্তান স্কুল থেকে হাসিমুখে বাড়ি ফিরেছিল।’

হঠাৎ আকাশে ড্রোনের শব্দ শুনতে পান তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই পর পর দুটি বিস্ফোরণের আওয়াজ পান।

গুলেদ বলেন, ‘বাইরে বের হয়ে দেখি আমার সন্তানরা সবাই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে।’

আরেক বাসিন্দা মরিয়ম নুর বুরুজি বলেন, ‘আমার সৎমেয়ে গর্ভবতী ছিল। আশপাশে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য স্কুলের দিকে ছুটে গিয়েছিল সে। তার পিঠে বাঁধা ছিল দুই বছর বয়সী শিশু।’

গর্ভবতী ওই নারী নিহত হলেও শিশুটি বেঁচে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দুটি মিসাইল সরাসরি ওই স্কুলটিতে আঘাত হানে।

আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ হাসান আবদুল্লাহ গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলাম আমি। ভেবেছিলাম পরিবারকে সরিয়ে নিতে পারব। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।’

ওই দিনের হামলায় আবদুল্লাহর বাড়িও ধ্বংস হয়ে যায়। নিহত হন তার ২৬ বছর বয়সী স্ত্রী ফারহিয়ো হাসান নূর ও ১০ মাস বয়সী মেয়ে লায়লা।

স্থানীয় কৃষক গেদো ইব্রাহিম বলেন, ‘খেতে কাজ করছিলাম আমি। খবর পাই, আমার বাড়িতেও হামলা হয়েছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি, বাড়ি নেই। পুরোটাই ধ্বংসস্তূপ। খুঁজে খুঁজে দুই মেয়ে—নয় বছর বয়সী মারিয়াম ও সাত বছর বযসী ফারহিয়োর মরদেহ পাই।’

তবে আমিনা নামে তার আরেক মেয়ে বেঁচে ছিল বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘ওই মেয়েটার শরীরে অসংখ্য ধাতব টুকরা ঢুকে গিয়েছিল।’

তথ্য-প্রমাণে যা জানা গেল

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মার্কিন ড্রোনগুলো সম্ভবত কেনিয়ার উপকূলের আরও দক্ষিণে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি ‘ক্যাম্প সিম্বা’ থেকে উড়ে এসেছিল।

ড্রোনগুলো ছিল আধুনিক এমকিউ-৯ রিপার ধরনের, যা ‘হান্টার কিলার’ নামে পরিচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরণের ড্রোনে অত্যন্ত উন্নত ক্যামেরা থাকে। যার মাধ্যমে মাটিতে থাকা মানুষকে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা বিশ্লেষক ব্রেট ভেলিকোভিচ বলেন, ‘ড্রোনের ওই ক্যামেরা দিয়ে গাড়ির নম্বর প্লেট পর্যন্ত পরিষ্কার পড়া যায়।’

তার মানে ড্রোনের লাইভ ভিডিও ফিড বা ‘ফুল-মোশন ভিডিওর’ মাধ্যমে সোমালিয়ার জামামে শহরের ভেতরে জীবনযাত্রার সব খুঁটিনাটি বিবরণ সরাসরি দেখতে পাচ্ছিলেন মার্কিন পাইলটসহ সংশ্লিষ্টরা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গার্ডিয়ান জানায়, সবমিলিয়ে ওই দিন অন্তত ১৫টি বিস্ফোরণ ঘটে এবং স্কুল ছাড়াও ১৮টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।

উন্নত প্রযুক্তির ওই ড্রোন ক্যামেরায় যদি মানুষসহ সব কিছু স্পষ্ট দেখা যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কেন নারী ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করলো?—এ প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

কেন হামলা?

হামলার পরদিন মার্কিন আফ্রিকা কমান্ড (আফ্রিকম) এক বিবৃতিতে ওই এলাকায় বিমান ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে।

তাদের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল জঙ্গিগোষ্ঠী আল-শাবাব।

কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলার সময় শহরটিতে আল-শাবাবের কোনো উপস্থিতি ছিল না।

স্থানীয় বাসিন্দা মারিয়ান গুলেদ বলেন, ‘আমাদের শহরে শুধু নারী, শিশু, বৃদ্ধ, কৃষক ও পশুপালক ছিল। হামলার আগে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত ছিল।’

এ অবস্থায় মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভুল তথ্যের ভিত্তিতে হামলা চালিয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য সরবরাহ করে থাকতে পারে।

ট্রাম্পের বক্তব্য

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমালিয়া নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে একাধিক অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন।

তিনি কখনো সোমালিয়াকে ‘অপরাধে ভেঙে পড়া দেশ’ বলেছেন। আবার কখনো সোমালিদের ‘কম আইকিউসম্পন্ন’ বলে মন্তব্য করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন বক্তব্য সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে সোমালিদের জীবনকে কম গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করে থাকতে পারে।

তবে হোয়াইট হাউস এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

হামলার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেনি যুক্তরাষ্ট্র বা সোমালিয়া। এমনকি নিহতদের পরিবারের সঙ্গেও কেউ যোগাযোগ করেনি।

যদিও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা বা সতর্কতা ছাড়া হামলা চালানো অপরাধ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আজও জামামের আকাশে ড্রোন উড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। যারা রয়ে গেছেন, তারা প্রতিদিন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।