ইউরোপে অসহনীয় তাপপ্রবাহের কারণ কী, যা জানালেন বিজ্ঞানীরা
রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়েছে। এতে মহাদেশজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, স্কুল-কলেজ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আর ইউরোপের প্রায় অর্ধেক বড় শহর নজিরবিহীন ‘হিট স্ট্রেস’-এর মুখে পড়েছে।
তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ইউরোপজুড়ে চলমান রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ এত তীব্র হয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ) বলেছে, ৫০ বছর আগেও জুন মাসে এমন ব্যতিক্রমী তাপমাত্রা সৃষ্টি হওয়া ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল।
ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীদের করা গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৬ সালের জুনে একই ধরনের তাপপ্রবাহ হলেও দিনের তাপমাত্রা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকত।
গবেষণার প্রধান লেখক লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের থিওডোর কিপিং বলেন, বর্তমানে পৃথিবী অনেক বেশি উষ্ণ, ফলে এ ধরনের তাপপ্রবাহের সম্ভাবনাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন না হলে জুন মাসে এ ধরনের ঘটনা ঘটাই সম্ভব হতো না।’
কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।
বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন ও তীব্র হয়ে উঠছে। তাই বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা জলবায়ু সংকটের ভয়াবহ প্রভাব এড়ানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। চলতি সপ্তাহে সেখানে কয়েক কোটি মানুষ প্রচণ্ড গরমে ভুগেছেন এবং কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়েছে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ডব্লিউডব্লিউএর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, ‘আবহাওয়ার ধরনটি নিজে খুব অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু তাপমাত্রা অবশ্যই অস্বাভাবিক—অন্তত মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের আগে তা-ই ছিল।’
‘অস্বস্তিকর ও বিপজ্জনক’
তাপপ্রবাহ এখনও চলমান থাকায় বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাসভিত্তিক তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ২০০৩ ও ১৯৭৬ সালের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি কতটা ভিন্ন।
গবেষকদের মতে, ২০০৩ সালে ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেই সময়ের তুলনায়ও বর্তমান তাপপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি তীব্র।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৩ সালের জুনে একই ধরনের তাপপ্রবাহ ঘটলে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম হতো।
বিজ্ঞানীরা বলেন, ‘২০০৩ সালেও দিনের বেলায় এ ধরনের তাপমাত্রা খুবই বিরল ছিল, আর রাতের তাপমাত্রা এত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা বর্তমানের তুলনায় শতগুণেরও কম ছিল।’
তাদের ভাষায়, ‘আমাদের বিশ্লেষণ দেখায়, মানুষের জীবদ্দশার মধ্যেই চরম তাপমাত্রা দ্রুত বেড়েছে। ২০০৩ সালের তুলনায় এ ধরনের ঘটনা এখন কয়েক দশক থেকে শতগুণ বেশি সম্ভাব্য, আর মাত্র ৫০ বছর আগে তা প্রায় অসম্ভব ছিল।’
তারা জোর দিয়ে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনই নিঃসন্দেহে এর জন্য দায়ী।’
গবেষকদের মতে, এ তাপপ্রবাহে প্রাকৃতিক উষ্ণায়নচক্র এল নিনোর কোনো ভূমিকা ছিল না।
অটো উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতার মিলিত প্রভাবে সৃষ্ট ‘হিট স্ট্রেস’-এর ঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরেন।
শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে হিট স্ট্রেস দেখা দেয়। এতে মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা থেকে শুরু করে অঙ্গ বিকল হওয়া, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
গবেষণায় বিশ্লেষণ করা ইউরোপের প্রায় ৮৫০টি শহরের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশে জুন মাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ হিট স্ট্রেসের রেকর্ড ভাঙেছে অথবা ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে।
অটোর মতে, এ কারণে তাপপ্রবাহটি ‘বিশেষভাবে অস্বস্তিকর ও বিপজ্জনক’ হয়ে উঠেছে।
এ বছর ইউরোপে এটি দ্বিতীয় বড় তাপপ্রবাহ। এর আগে মে মাসে মৌসুমের শুরুতেই মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রীষ্মের চূড়ান্ত সময়ের মতো তাপমাত্রা অনুভূত হয়েছিল।
ডব্লিউডব্লিউএ বলেছে, ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ তাপমাত্রা ও তার পরিণতি এড়াতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতালে রোগীর চাপ, মদ্যপানে নিষেধাজ্ঞা
ফ্রান্সে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের কারণে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্যারিসে সাময়িকভাবে প্রকাশ্যে মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রাজধানীতে অ্যাম্বুলেন্স সেবায় স্বাভাবিকের তুলনায় চার গুণ বেশি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, এমনকি তরুণদের মধ্যেও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার নজির মিলেছে।
প্যারিস পুলিশ প্রধান পাত্রিস ফোর বৃহস্পতিবার বলেন, হাসপাতালগুলো প্রায় সক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে।
তিনি জানান, রোগীর চাপ কমাতে প্রকাশ্যে মদ্যপান ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অ্যালকোহল বিক্রি নিষিদ্ধসহ নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ফোর বলেন, ‘আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে হাসপাতালের ওপর চাপ কমে আসে।’
ফরাসি স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্তেফানি রিস্ত জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় প্যারিসের অ্যাম্বুলেন্স সেবায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চার গুণ বেশি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুধু বয়স্ক নয়, তরুণদের মধ্যেও এমন ঘটনা দেখা যাচ্ছে।
শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে শনিবার সকাল ৭টা পর্যন্ত এবং একইভাবে শনিবার দুপুর থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত প্যারিসে প্রকাশ্যে মদ্যপান নিষিদ্ধ থাকবে। তবে রেস্তোরাঁ ও ক্যাফের উন্মুক্ত আসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়া, শুক্রবার ও শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন সকাল ৭টা পর্যন্ত অ্যালকোহল বিক্রিও বন্ধ থাকবে।
বুধবার প্যারিসে তাপমাত্রা ৪০ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে জুন মাসের নতুন রেকর্ড গড়ে। বৃহস্পতিবারও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি ছিল।
তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ার পর থেকে ফ্রান্সে পানিতে ডুবে অন্তত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া, গাড়ির ভেতরে অতিরিক্ত গরমে তিন শিশুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
প্যারিসের প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে সহায়তা করতে নগর কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু উন্মুক্ত অনুষ্ঠানে আগেই অ্যালকোহল বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বহু স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং পার্কগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র আইফেল টাওয়ার এবং ল্যুভর মিউজিয়াম প্রচণ্ড গরমের কারণে এ সপ্তাহের শুরুতেই তাদের দর্শন সময় কমিয়ে দেয়।
ফ্রান্সের মোট ৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ এ সপ্তাহে তাপপ্রবাহের সর্বোচ্চ ‘রেড অ্যালার্ট’-এর আওতায় ছিলেন।
অতিরিক্ত গরম পানির কারণে নদীর তাপমাত্রা আরও না বাড়ানোর জন্য বৃহস্পতিবার দেশটির দুটি পারমাণবিক চুল্লি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এদিকে সপ্তাহের শুরুতে ব্রিটানি ও পেই দ্য লা লোয়ার অঞ্চলের পোলট্রি খামারগুলোতে প্রচণ্ড গরমে বিপুল সংখ্যক পাখির মৃত্যু হয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, ফ্রান্সে আরও কয়েক দিন তীব্র গরম অব্যাহত থাকতে পারে।
