ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ২৯৫৪, উদ্ধার অভিযান শেষের পথে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ভেনেজুয়েলার বিধ্বংসী দুই ভূমিকম্পে মৃত্যু বেড়ে প্রায় ৩ হাজার জনে পৌঁছেছে। গতকাল শনিবার প্রকাশিত সরকারি হালনাগাদ তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। এমনটি জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

গত ২৪ জুনের এই বিপর্যয়ে কয়েক হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে রাস্তায় বা শিবিরে দিন কাটাচ্ছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপের ভেতর তল্লাশি অভিযান সমাপ্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুক্রবারের তথ্যে যে মৃত ছিল, গতকাল তা ৩০০ বেড়ে ২ হাজার ৯৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে।

এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। সরকার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না দিলেও জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর প্রায় ৫০ হাজার মানুষের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

লাতিন আমেরিকার অন্যতম ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের আঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের উত্তরের উপকূলীয় এলাকা লা গুয়াইরাতে, যেখানে অসংখ্য আবাসিক ভবন ধসে মাটির সাথে মিশে গেছে।

মাত্র ৩৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে হওয়া এই জোড়া ভূমিকম্পের দশ দিন পরও শোকাতুর পরিবারগুলো ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে তাদের প্রিয়জনদের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে প্রাণ বাঁচানোর জন্য প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ধরা হয়, যদিও চলতি সপ্তাহেও কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

উদ্ধার অভিযান শেষ হয়ে আসার ইঙ্গিত হিসেবে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল এবং তাদের উদ্ধারকারী কুকুরগুলোকে পদক দেওয়ার জন্য একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

রদ্রিগেজ বলেন, পুরো ভেনিজুয়েলা আজ গভীর শোকে আচ্ছন্ন। যারা সব হারিয়েছেন, তারা এখনো প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে আছেন।

শনিবার উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু স্কোয়াড এবং দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দলসহ আন্তর্জাতিক দুর্যোগ মোকাবিলা দলগুলো তাদের উদ্ধার অভিযান শেষ করতে শুরু করেছে।

লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি ফায়ার ডিপার্টমেন্টের উদ্ধারকারী দলটি তাদের সর্বশেষ তল্লাশিতে প্রাণের কোনো চিহ্ন না পেয়ে অভিযান সমাপ্ত করছে। এ ছাড়া ফ্লোরিডা ও ভার্জিনিয়ার দলগুলোও এই সপ্তাহান্তে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ভেনিজুয়েলার অনেক বাসিন্দা দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ধীরগতির কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক দলগুলো পৌঁছানোর আগে শুরুর কয়েক ঘণ্টা পরিবারগুলো নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে প্রিয়জনদের বের করার চেষ্টা করেছিল।

তবে রদ্রিগেজ তার সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন যে, হাজার হাজার সেনা ও কর্মকর্তাকে উদ্ধারকাজে মোতায়েন করা হয়েছিল।

লা গুয়াইরা এলাকায় এখন বড় বড় মেশিন দিয়ে ভাঙা ভবনগুলো সরানোর কাজ চলছে। এর মাঝেই অনেক পরিবার তাদের আত্মীয়-স্বজনের লাশ খুঁজে বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

স্বেচ্ছাসেবক ফ্রান্সিসকো সাসকুইয়া বলেন, আমরা এখনো মৃতদেহ খুঁজছি। কাজটা খুব কঠিন, তবুও আমরা হাল ছাড়িনি। আজ দুটি মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে পাঠিয়েছি।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬৭০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ নষ্ট হয়েছে, যা দেশটির জিডিপির ৬ শতাংশ।

ভেনেজুয়েলা আগে থেকেই দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত ছিল, যার ফলে দেশটির হাসপাতাল ও রাস্তাঘাটের অবস্থা এমনিতেই নাজুক ছিল।

রাজধানী কারাকাসের কাছে মাইকুয়েতিয়া বিমানবন্দরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে এখান থেকে শুধু ত্রাণবাহী বিমান চলাচল করছে, সাধারণ যাত্রী পরিবহন বন্ধ আছে।

রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিমানবন্দরটি দ্রুত মেরামতের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সব হারানোর এই মিছিলে ভিক্টর কলিভার্টের মতো মানুষেরা এখন কেবল স্বজনদের শেষ স্মৃতিটুকু আঁকড়ে ধরতে চান।

ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া তার ভাগ্নের মরদেহের পাশ থেকে তিনি সরছেন না। পাছে বিশৃঙ্খলার মাঝে মরদেহটি হারিয়ে যায়, তাই তিনি ফরেনসিক কর্মকর্তাদের তা নিতে বাধা দিয়েছেন।

ভিক্টর বলেন, আমাকে যদি চীন বা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেতে হয়, আমি যাব; কিন্তু ওকে আমি একা ছাড়ব না। আমি ওর সাথেই থাকব।