ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কীভাবে অপসারণ করা যায়

মহিউদ্দিন আলমগীর
মহিউদ্দিন আলমগীর

ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তীব্র আন্দোলন চলছে। এর মধ্যেই একটি বড় বিষয় সামনে এসেছে। আর তা হলো, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ, পদত্যাগ ও অপসারণ প্রক্রিয়া।

সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবি জোরদার হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার জন্য তিনিই দায়ী। এই সংখ্যা বাংলাদেশের মোট ভোটারের চেয়েও বেশি।

ভারতের কংগ্রেস ও তরুণদের ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ আন্দোলনসহ অনেকেই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি তুলেছে। পদত্যাগ করাটা সহজ। কিন্তু আইনগতভাবে তাকে অপসারণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল। এটি সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারককে অপসারণের মতোই কঠিন।

ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের পদ্ধতির কথাও লেখা রয়েছে। ৩২৪ (৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারককে যে কারণে ও পদ্ধতিতে অপসারণ করা হয়, তার ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে তা সম্ভব নয়।

নিয়োগ

ভারতে ২০২৩ সালের ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি ও পদের মেয়াদ)’ আইন অনুযায়ী সিইসি নিয়োগ দেওয়া হয়। তাকে নিয়োগ দেন দেশটির রাষ্ট্রপতি।

আইনে বলা হয়েছে, ভারত সরকারের সচিব বা সমমর্যাদার পদে কর্মরত বা সাবেক কর্মকর্তারা এই পদের যোগ্য হবেন। তাদের অবশ্যই ‘সৎ এবং নির্বাচন পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা’ থাকতে হবে।

আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি সার্চ কমিটি প্রথমে পাঁচজনের একটি নামের তালিকা তৈরি করে। পরে তা বাছাই কমিটির কাছে বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়।

এই বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারকে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এই বাছাই কমিটির প্রধান। অন্য দুই সদস্য হলেন, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একজন মন্ত্রী।

তবে ২০২৩ সালে নিয়োগ আইনে একটি বড় পরিবর্তন আনা হয়। বদলানো হয় সার্চ কমিটির কাঠামো। আগে সার্চ কমিটিতে থাকতেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতি। ২০২৩ সালের আইনে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে সেখানে একজন কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীকে নেওয়া হয়। এই পদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বেছে নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।

সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বেড়েছে। কারণ, বাছাই কমিটির তিন সদস্যের মধ্যে দুজনই ক্ষমতাসীন দলের।

তবে পদত্যাগের প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্য যেকোনো কমিশনার যেকোনো সময় রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের হাতে লেখা চিঠি দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন।

অপসারণ

প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করতে হলে ১৯৬৮ সালের ‘জাজেস ইনকুয়ারি অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, একটি আধা বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের দুটি কারণে অপসারণ করা যায়—প্রমাণিত অসদাচরণ ও অক্ষমতা।

অপসারণের জন্য লোকসভার অন্তত ১০০ জন বা রাজ্যসভার অন্তত ৫০ জন সদস্যকে লিখিত নোটিশে সই করতে হয়। লোকসভার স্পিকার বা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান নোটিশ ও আনুষঙ্গিক তথ্য যাচাই করেন। এরপর তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন।

প্রস্তাবটি গৃহীত হলে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক, হাইকোর্টের একজন বিচারক ও একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ থাকেন। তদন্ত চলাকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার পান। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে প্রস্তাব বাতিল হয়ে প্রক্রিয়াটি শেষ হয়।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রতিবেদনটি সংসদে জমা দেওয়া হয়। অপসারণ প্রস্তাবটি পাসের জন্য সংসদের উভয় কক্ষে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের ভোট প্রয়োজন হয়।

প্রস্তাবটি উভয় কক্ষে পাস হলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি অপসারণের আদেশ জারি করেন।

শত কোটির বেশি ভোটারের দেশ ভারতে তথ্য যাচাইয়ের সময় ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গত মাসে দেশটির গণমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্দোলনের পালে হাওয়া লাগে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ মাসে দুজন নির্বাচন কমিশনার অন্তত ১৪ বার সিইসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ভোটার তালিকা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে সিইসির সিদ্ধান্তের বিষয়ে তারা আপত্তি তোলেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুরু হওয়া সর্বশেষ সংশোধনীতে ১৩ কোটির বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের সবশেষ সাধারণ নির্বাচনে ভোটার ছিল ৯৬ কোটি। যার মধ্যে ভোট দিয়েছিলেন প্রায় ৬৫ কোটি মানুষ।