‘আমার কোথাও যাওয়ার নেই’

স
সোহানুর রহমান রাফি

এক সময় ছিল পাঁচ বিঘা জমি, ফলের বাগান, বসতভিটা আর ৩০টিরও বেশি মহিষ। নিজের জমিতে চাষাবাদ করতেন, মহিষ চড়াতেন। বাড়ির চারপাশে ছিল আম, লিচু আর লেবুর বাগান।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা গ্রামের গোলাম রসুলের জীবনে এখন আর সেই স্বাচ্ছন্দ্য নেই। পদ্মার ভাঙনে প্রায় সব হারিয়েছেন তিনি। নিজের বলতে আছে মাত্র দুই-তিন কাঠা জমি।

সাত বছর আগে ২০ লাখ টাকা খরচ করে যে পাকা বাড়ি তৈরি করেছিলেন, সেটিরও অর্ধেক চলে গেছে নদীর গর্ভে। যেকোনো সময় বাকিটুকু পদ্মায় বিলীন হয়ে যেতে পারে।

ওই বাড়িটিতে বাস করাও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। যে কারণে আপাতত প্রতিবেশীর জমিতে একটি ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে সস্ত্রীক আশ্রয় নিয়েছেন।

নিজের বাড়ির দিকে তাকিয়ে গোলাম রসুল বলেন, ‘এখানে আমার পাঁচ বিঘা জমি ছিল। এখন সব ভেঙে শুধু এই ঘরের জায়গাটুকু আছে। আর আছে মাত্র এই দুই-তিন কাঠা জমি।’

‘সাত বছর আগে ২০ লাখ টাকা খরচ করে এই পাকা বাড়ি করেছিলাম। সেটারও অর্ধেক এখন নদীর মধ্যে।’

একসময় রসুলের ৩০টির বেশি মহিষ ছিল, তার মধ্যে এখন বেঁচে আছে মাত্র তিনটি। চার-পাঁচ বছর আগে হঠাৎ তার প্রায় ২০টি মহিষ মারা যায়।

তিনি বলেন, ‘আগে অনেক জায়গাজমি ছিল, মহিষ চরাতাম। এখন ভাঙতে ভাঙতে এই অবস্থা হয়েছে। আগে চাষাবাদ করতাম। এখন সেই জমিজমা শেষ হয়ে গেছে।’

নিমতলা একসময় ছিল বড় একটি পাড়া। প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি পরিবারের বসতি ছিল। বছরের পর বছর পদ্মার ভাঙনে একে একে বিলীন হয়েছে সেসব বাড়িঘর, মন্দির, জমিজমা।

গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর অন্যতম ভাঙনপ্রবণ এলাকা গোদাগাড়ী। ২০২১ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে এই উপজেলায় ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮৮টি পরিবার। এর মধ্যে মাত্র ৯১টি পরিবার সহায়তা পেয়েছে।

একই এলাকার বাসিন্দা প্রশান্ত কুমার মণ্ডলের বাড়িও নদীর একেবারে তীর ঘেঁষে। তার ভাষ্য, চার-পাঁচ বছর আগেই এ এলাকার অনেক বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এ বছরও ভেঙে গেছে পাঁচ থেকে সাতটি বাড়ি।

তিনি বলেন, ‘পুরো এলাকাটাই একসময় বড় একটা পাড়া ছিল। মাঝখান দিয়ে সড়ক ছিল, দুই পাশে বাড়িঘর ছিল। সামনে একটা মন্দির ছিল, সেটাও নদীতে চলে গেছে।’

অনেকে অন্য জায়গায় গিয়ে নিজের জমিতে ঘর তুলেছেন। রসুলের সেই সুযোগ নেই। যে টুকু জমি অবশিষ্ট আছে, সেটাও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। কোনো ধরনের সহায়তাও পাননি। তাই প্রতিবেশীর জমিতে সাময়িক আশ্রয় নিয়েছেন।

রসুল বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পাইনি। আমার বাড়ির এখানে জিও ব্যাগও দেয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেরই অন্য এলাকায় জমি ছিল, তারা সেখানে চলে গেছেন। কিন্তু আমার এই জায়গাটুকু ছাড়া আর কিছু নেই। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।’

তিনি জানান, কয়েক দিন আগে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কার্যালয় থেকে লোকজন এসে তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হবে। এরপর আর কোনো খবর পাননি তারা। তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগও করা হয়নি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, নদীতীর সংরক্ষণকাজের আওতার বাইরে থাকা এলাকাগুলোতেই ভাঙন হয়েছে। নদীর পাড়ে যাদের বাড়িঘর ছিল, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পদ্মার ওপারে চর আষাড়িয়াদহেও ব্যাপক ভাঙন হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বন্যার সময় ভাঙন দেখা দিলে আমরা জরুরি ভিত্তিতে কাজ করি। বন্যার পর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে বরাদ্দের ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। সব এলাকা সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ আসে না।’

‘জরুরি জায়গাগুলোতে কাজ করা হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।

গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান বলেন, নদীভাঙনে যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের টিন, আর্থিক সহায়তা ও শুকনা খাবার দেওয়া হয়। এছাড়া আবেদন করলে বিভিন্নভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

নিমতলার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং সেখানে দুটি বাড়ি দেখেছেন, যেগুলোর অংশবিশেষ নদীর ওপর ঝুলে আছে।

‘আমরা সেখানে জিও ব্যাগ ফেলতে বলেছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এস্টিমেশনেও এটি রয়েছে। তারা জিও ব্যাগ ফেলবে,’ বলেন তিনি।

ইসরাত জাহান জানান, ক্ষতিপূরণ পেতে তাদের আবেদন করতে বলা হয়েছিল, তবে তারা এখনো আবেদন করেননি।

ওই এলাকা আবার পরিদর্শন করা হবে বলে জানান তিনি।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিজস্ব জমি থাকলে ঘর তৈরির জন্য টিন দেওয়া হবে। আর জমি না থাকলে বন্দোবস্তের জন্য আবেদন করতে হবে। পরে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত তাদের প্রাথমিক সহায়তা দেওয়া হবে, জানান তিনি।

জিও ব্যাগ ফেলে নদীতীর রক্ষা করলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করেন ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘এই বাড়িগুলো ফাউন্ডেশন ছাড়াই তৈরি করা। পদ্মা পাড়ের মাটি তো আলগা বালুমাটি। সেখানে সুরক্ষা দিলেও নিচ থেকে মাটি সরে গেলে আগের অবস্থাই হবে।’