সৌদি বিমানবন্দরে দ্বিতীয় হামলায় নিহত ১, আহত ১১

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রোববার নতুন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১১ জন। এর এক দিন আগে বিমানবন্দরটিতে হুতিদের দাবি করা হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা বিস্ফোরকবাহী বস্তু রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ৪-এ আঘাত হানে। এতে আগুন ধরে যায়।

ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। পরে দেশটির পূর্বাঞ্চলে একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়। এ ছাড়া, খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়েছে।

সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, আজ সোমবার ভোরে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আভায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। পরে বিপদের আশঙ্কা কেটে যায়।

রয়টার্স বলছে, এসব হামলায় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। অন্যদিকে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে হুতিরা।

শনিবার রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার পর সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ধর্মীয় তীর্থযাত্রীরা ইসলামের দুই পবিত্র স্থান ভ্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে একটি ফটকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। এ সময় উজ্জ্বল কমলা রঙের বিস্ফোরণের ঝলক দেখা গেলে আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন তারা। ভিডিওতে বিমানবন্দরের ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়তেও দেখা যায়।

ওই হামলার পর বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছবি: রয়টার্স

হামলার দায় স্বীকার হুতিদের

রোববার টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি শনিবারের হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তিনি আরও দাবি করেন, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দাম্মাম বিমানবন্দর এবং দেশটির তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর দুটি স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি।

এ বিষয়ে সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তর ও আরামকোর জবাব পাওয়া যায়নি।

রোববার রাতে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। তারা জানায়, বিমানবন্দরের স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও নিরাপত্তা পরীক্ষা চলছে।

রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে দাম্মাম বিমানবন্দরে ট্যাক্সি করার সময় এক উড়োজাহাজের যাত্রী পার্ক করে রাখা উড়োজাহাজের পাশে রানওয়েতে একটি বস্তুকে আঘাত হানতে দেখেন। এতে আগুন ধরে যায়। পরে উড়োজাহাজটি আবার গেটে ফিরে আসে। যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে উড়োজাহাজটিকে বিমানবন্দর ত্যাগ করতে বলা হয়।

বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার দাম্মাম বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ফ্লাইটের অবতরণ ও উড্ডয়নে বিলম্ব হয় এবং কিছু ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এটি সৌদি আরবের তৃতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর।

এর আগে রোববার সৌদি আরবের বিমানবন্দর ব্যবহার না করার বিষয়ে আবারও সতর্ক করে হুতিরা। গোষ্ঠীটি জানায়, তাদের সতর্কবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলে তার দায় সৌদি আরবকেই নিতে হবে।

সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ব্রিটিশ নাগরিকদের মদিনা বিমানবন্দর ছাড়া জেদ্দা, দাম্মামসহ দেশটির অন্য সব বিমানবন্দরে যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এসব স্থানে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের উদ্দেশে বা দেশটির আকাশসীমা দিয়ে চলাচলের সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে মার্কিন বিমান সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।

ছবি: রয়টার্স

‘আরও খারাপ পরিস্থিতি আসতে পারে’

সম্প্রতি ইয়েমেনে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে সৌদি আরব। গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নেয় হুতিরা। এরপর তাদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি পাল্টা অভিযানে ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে রিয়াদ।

হুতিদের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে ১২৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব।

হুতি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আল মাসিরা টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সৌদি শত্রুরা ইয়েমেনে আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপ বন্ধ না করলে সামনে আরও খারাপ পরিস্থিতি আসবে।’

শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা বৃহত্তর যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এ সংঘাতে।

এদিকে, টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে সহায়তা করতে তেহরান প্রস্তুত বলেও তাকে জানিয়েছেন আরাগচি।

ছবি: রয়টার্স

হামলার মধ্যেও চলছে জ্বালানি সম্মেলন

রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের একটি সম্মেলন কেন্দ্রে রোববার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ডব্লিউপিসি এনার্জির পাঁচ দিনব্যাপী সম্মেলন পূর্বনির্ধারিত সময়েই শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ফোরামের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে কোন কোন দেশের মন্ত্রীরা এতে অংশ নিয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।

সম্মেলনের সহ-আয়োজক ইতালির জ্বালানিমন্ত্রী গিলবার্তো পিচেত্তো ফ্রাতিন শুক্রবার জানিয়েছিলেন, তিনি ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে সম্মেলনে অংশ নেবেন।

জার্মান কর্মকর্তারা দেশটির অর্থনীতিমন্ত্রী ক্যাথারিনা রাইখের দেশে ফেরার জন্য বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছিলেন। সোমবার রিয়াদ থেকে বার্লিনে ফেরার কথা ছিল তার। তবে জার্মানির অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তার ফ্লাইট উড্ডয়ন করতে না পারার আশঙ্কায় রয়েছে।

এদিকে, নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে রিয়াদের স্কুলগুলোতে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সশরীরে পাঠদান বন্ধ রেখে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

রোববারের হামলা নিয়ে চলতি সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবারের হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন চারজন সৌদি নাগরিক। বাকিরা বিদেশি নাগরিক।