‘ক্ষমতাবানদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও কেউ নিরাপদ নয়’

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সুইজারল্যান্ডের পর্যটন শহর দাভোসে চলছে বিশ্ব অর্থনীতি সম্মেলন। এখানে চলমান বিশ্ব-পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা নিয়ে বিস্ফোরক বক্তব্য রেখেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।

গতকাল মঙ্গলবার এই তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি।

জাস্টিন ট্রুডোর কাছ থেকে শাসনভার বুঝে নেওয়ার পর এক বছরেরও কম সময় পার করেছেন মাইক কার্নি। তিনি তার ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্ণধার হিসেবে। নিজে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে না জড়ালেও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেই ছিল তার ওঠা-বসা।

ক্ষমতাবানদের ইচ্ছায় চলছে বিশ্ব

'রকস্টার ব্যাংকার' হিসেবে পরিচিত কার্নি তার বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

তার বক্তব্যের মূল কথা: ক্ষমতাবানরা যা করতে চায়, তাই করে। দুর্বলরা বাধ্য হয় দুর্ভোগ পোহাতে।

trump_carney.jpg
ওভাল অফিসে কার্নি-ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বক্তব্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন কার্নি। বেশিরভাগ অংশে ছিল প্রথাগত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির দৈন্যদশা। কানাডার নেতা হুশিয়ারি দিয়ে বলেন—বিশ্ব এখন যেভাবে চলছে, এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও কোন দেশ নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারবে না।

'পুরনো ব্যবস্থা আর ফিরে আসবে না। ওটার জন্য শোক করে লাভ নেই,' বলে মনে করেন কার্নি।

তার মতে, পুরনো স্মৃতি আঁকড়ে পড়ে থাকা কোনো কৌশল হতে পারে না।

প্রায় ৮০ বছর ধরে প্রচলিত ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে চায় ওয়াশিংটন

দাভোসে কার্নির বক্তব্যের সময় উপস্থিত রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমকর্মী ও শীর্ষ ব্যবসায়ীরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান। তুমুল করতালির মাধ্যমে তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশের পাশাপাশি তাকে সম্মান দেখান।

নিজের লেখা বক্তব্যে একবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করেননি কার্নি। তবে তিনি হোয়াইট হাউসের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্পষ্ট হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কার্নির ভাষ্য, 'সবাই মিলে সমস্যার সমাধান করার যে কাঠামো গত আট দশক ধরে বিশ্বে প্রচলিত ছিল, তা চুরমার করে দিতে চাচ্ছে ওয়াশিংটন।'

কানাডার প্রধানমন্ত্রী হুশিয়ারি দেন, বিশ্বের 'ক্ষমতাধর দেশগুলো' অর্থনৈতিক শক্তিমত্তাকে 'অস্ত্র' হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও জানান, ওই ক্ষমতাবানরা আলোচনার টেবিলে শুল্ককে দরকষাকষির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে। জোরজবরদস্তি করে লক্ষ্য পূরণ করতে নিজের শক্তিশালী আর্থিক অবকাঠামোকে কাজে লাগাচ্ছে।

পাশাপাশি, অন্যের দুর্বলতার সুযোগ নিতে সরবরাহ শৃঙ্খলকে নিয়ামক হিসেবে ব্যবহার করছে, বলেও মন্তব্য করেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী।

'দুর্গ' গড়েও লাভ নেই

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার বিপদ নিয়েও হুশিয়ারি দেন তিনি। জানান, অন্যের বিষয়ে নাক না গলিয়ে নিজেরা 'দুর্গ' গড়ে তোলার চেষ্টা করলে তা আরও ভঙ্গুর হবে এবং টেকসই হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকবে।

মার্ক কার্নি বলেন, 'কানাডার মতো মধ্যম মাত্রার শক্তিশালী দেশগুলোকে নতুন এই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। এটা অবশ্যই করতে হবে। তবে আমরা শুধু উঁচু দেয়াল তৈরি করে তাল মেলাবো, নাকি আরও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেব—প্রশ্ন সেখানেই।'

Carnie Xi Xin Ping
চীনের নেতা শি জিন পিং-এর সঙ্গে কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি। ছবি: রয়টার্স

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতিবিদ থেকে কার্নির বিশ্বনেতা হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যে বিশেষ তত্ত্ব, তাতে বলা হয়েছে—শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী হয়ে, ভালো অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে বা দীর্ঘদিন একই জোটের অংশ থাকলেই কানাডার উন্নয়ন-নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।

কানাডার সঙ্গে চীনের সাম্প্রতিক বাণিজ্য আলোচনা উল্লেখ করেন কার্নি। কানাডার তেল খাতে বেইজিংয়ের বিনিয়োগ নিশ্চিতের পাশাপাশি চীনের ইলেকট্রনিক গাড়ির ওপর শুল্ক কমানোরও সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির একেবারে বিপরীত।

'খাদক হতে না পারলে খাদ্য হতে হবে'

কার্নি জানান, অন্যান্য দেশের সঙ্গে কৌশল নির্ধারণে কানাডা তাদের মূলনীতিতে আরও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে। কানাডা ও অন্যান্য মধ্যম সারির দেশগুলো বিশ্ব-রাজনীতির এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও  এলোমেলো সময়ে কীভাবে সামনে এগিয়ে যাবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী।

কার্নি বলেন, '(কানাডার মতো) মধ্যম মাত্রার ক্ষমতাধর দেশগুলোকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। কারণ, আপনি যদি খাবার টেবিলে খাদকের আসনে বসার সুযোগ না পান, তাহলে আপনার পরিণতি হবে খাদ্য হিসেবে। শক্তিধর দেশগুলো নিজেরা নিজেদের মতো চলতে পারে। তাদের বাজার বড়। সামরিক সক্ষমতার কারণে তাদের দরকষাকষির টেবিলে আধিপত্য দেখানোর সুযোগ আছে। মধ্যম শক্তির দেশগুলোর তা নেই।'

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি এমন নীতি গ্রহণ করবেন, যাতে বিভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণে বিভিন্ন ধরনের জোটে কানাডা যোগ দিতে পারে। কোন জোট গঠন করা হবে বা কোন জোটে যোগ দেবে কানাডা, তা নির্ধারণে ওই জোটের গুরুত্ব ও অটোয়ার স্বার্থের বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। তিনি তার এই নীতিকে 'ভ্যারিয়েবল জিওমেট্রি' বা পরিবর্তনশীল জ্যামিতি আখ্যা দেন।

পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন—কানাডা বিদ্যমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশেই আছে। তার দেশ ইউক্রেনকে সুরক্ষা দিতে লাখো ডলার সহায়তা দিয়েছে উল্লেখ করে কার্নি আরও বলেন, এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে এগিয়ে আসবে অটোয়া।

Carnie with Zelenskyi
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি। ছবি: রয়টার্স

কার্নি বলেন, 'অনেক দেশ শুধু শক্তিশালী দেশের বন্ধুত্ব চায়। এটা বিপদের কারণ হতে পারে।'

তার ভাষ্য, 'শক্তিশালী দেশের বন্ধু হতে গেলে আপনাকে দুর্বল অবস্থান থেকে দরকষাকষিতে যেতে হবে। তারা আমাদেরকে যা দেয়, তাই আমাদের গ্রহণ করতে হয়। আমরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ি। কে কার চেয়ে বেশি গ্রহণ করার মানসিকতা দেখাবে, তা নিয়ে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। এটাকে সার্বভৌমত্ব বলা যায় না। এভাবে মাথানত না রাখার মধ্যেই আছে সার্বভৌমত্বের সার্থকতা।'

'বৈধতা, সততা ও আইনের শাসন সব সময় শক্তিশালী থাকবে—যদি আমরা সবাই তা ধারণ করি। ক্ষমতাবানরা যাতে আমাদেরকে অন্ধ করে না রাখতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে,' যোগ করেন তিনি।