শিগগির পরমাণু অস্ত্র পরিকল্পনার ‘পরবর্তী ধাপ’ শুরু: কিম জং উন
প্রায় ১৪ বছর ধরে উত্তর কোরিয়া শাসন করছেন কিম জং উন। কেউ তাকে বলেন একনায়ক। কেউ বলেন স্বৈরশাসক। কেউ বলেন তার ইস্পাত কঠিন নেতৃত্বে দেশটির টিকে থাকার জন্য জরুরি।
কিমের শাসনামলে অর্থনীতি ও জনকল্যাণের দিক দিয়ে উন্নয়ন কতটূকু হয়েছে, সেটা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া না গেলেও পিয়ংইয়ং যে একটি সমীহ জাগানিয়া পরমাণু শক্তিতে রুপান্তরিত হয়েছে, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
কিমের ভাষায়, 'পরমাণু অস্ত্র উত্তর কোরিয়ার মানুষের অধীকার'। এ বিষয়ে কোনো আপোষে যেতে চান না তিনি।
দীর্ঘ সময় ধরে চলমান পরমাণু প্রকল্পের সব কাজ শেষ হয়েছে। চরম উৎকর্ষে পৌঁছে গেছে উত্তর কোরীয় পরমাণু প্রযুক্তি। এবার সময় এসেছে নতুন ধাপে উত্তরণের।
এএফপির প্রতিবেদন বলছে, খুব শিগগির উত্তর কোরিয়ার অবিসংবাদিত নেতা কিম পরমাণু পরিকল্পনাকে পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়ার কথা জানাবেন।
ক্ষমতাসীন দলের সম্মেলনে এসব পরিকল্পনা উপস্থাপন করবেন কিম জং উন।
দলের সম্মেলনে বিশেষ বার্তা
ওয়ার্কার্স পার্টির সম্মেলনটি আগামী দুই-এক সপ্তাহের মধ্যেই আয়োজিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ পাঁচ বছর আগে দলের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
ইতোমধ্যে এই সম্মেলনকে সামনে রেখে কিম ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন কিম।
সেখানে তিনি জানান, দলের সম্মেলনে 'পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিহতের উদ্দেশ্যে নির্মিত পরমাণু অস্ত্রগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করতে পরবর্তী পর্যায়ের পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হবে।'
বরাবরের মতো, এবারও কিমের সঙ্গে ছিলেন তার মেয়ে কিম জু অ্যায়ে ও অন্যান্য কর্মকর্তারা। তারা একটি 'বড় ক্যালিবারের' রকেট লঞ্চার পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করেন।
শত্রুদের অসহনীয় 'মানসিক যন্ত্রণা'
পরীক্ষার অংশ হিসেবে রকেট লঞ্চার থেকে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে বলে জানিয়েছে উত্তর কোরিয়ার সরকারি গণমাধ্যম কেসিএনএ।
অস্ত্র পরীক্ষার বিষয়ে কিম মন্তব্য করেন, 'যারা আমাদের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়ানোর উসকানি দেয়, তাদের জন্য এই পরীক্ষার ফলাফল ও গুরুত্ব অসহনীয় মানসিক যাতনা ও গুরুতর হুমকির কারণ হবে।'
কিম স্বীকার করেন, এই রকেট লঞ্চার তৈরির প্রক্রিয়াটি খুব সহজ ছিল না।
তিনি জানান, এই পরীক্ষায় পরমাণু যুদ্ধ ঠেকাতে আমাদের কৌশলগত অস্ত্রের উপযোগিতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
কেসিএনএ'র প্রকাশিত ছবিতে মেয়ের সঙ্গে কিমকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়।
উত্তর কোরিয়ার নেতা জানান, রকেটগুলো ৩৫৮ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লক্ষ্যে (পানিতে) আঘাত হানতে সফল হয়।
জাপান সমুদ্রের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হয়। দুইটি ক্ষেপণাস্ত্র জাপানের জন্য নির্ধারিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের ঠিক বাইরে পড়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জিজি প্রেস।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানানো হয়।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স অ্যানালাইসেস-এর প্রধান গবেষক লি হো-রাইউং এএফপিকে বলেন, আসন্ন সম্মেওনে কিম সম্ভবত 'পরমাণু অস্ত্রের সর্বোচ্চ কার্যকারিতা' অর্জনের লক্ষ্যের ঘোষণা দেবেন।
ওই গবেষক বলেন, 'কিম জং উন আগের সম্মেলনগুলোতে দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা পূরণে এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। এবার তিনি ওই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে জানিয়ে নতুন লক্ষ্যের ঘোষণা দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।'
গতকালের পরীক্ষা ছিল জানুয়ারির দ্বিতীয় পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা।
এর আগে, দক্ষিণ কোরিয়ার নেতা চীনে এক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে এক গুচ্ছ রকেট ছুড়েছিল উত্তর কোরিয়া।
ওই ঘটনার পর পেন্টাগনে জ্যেষ্ঠ্যতার দিক দিয়ে তৃতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবি সিউল সফরে যান।
তিনি দক্ষিণ কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য 'আদর্শ মিত্র' আখ্যা দেন।
কোরিয়ার যুদ্ধের পর ওয়াশিংটন-সিউলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।
পরমাণু অস্ত্র সমৃদ্ধ পিয়ংইয়ং থেকে সিউলকে সুরক্ষা দিতে ওয়াশিংটন দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বার্তা
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের বিশ্লেষক হং মিন এএফপিকে বলেন, 'পিয়ংইয়ং সম্ভবত ওয়াশিংটনকে একটি বার্তা দিতে চাইছে। যেকোনো হামলার জবাব দিতে তাদের হাতে অত্যাধুনিক ও অভাবনীয় অস্ত্র আছে—যা ভেনেজুয়েলার তুলনায় একেবারেই ভিন্ন মাত্রায়।'
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পরমাণু শক্তিতে চালিত সাবমেরিন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করে কিম একে 'হুমকি' আখ্যা দেন এবং 'পাল্টা জবাব' দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
প্রথম মেয়াদে তিনবার কিমের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তা সত্ত্বেও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে সই করতে কিমকে রাজি করাতে পারেননি ট্রাম্প।


