পোষা প্রাণী যেভাবে মুছে দিতে পারে আপনার একাকিত্ব
ভাইবোনেরা জীবিকার তাগিদে একে একে দেশের বাইরে স্থায়ী হয়েছেন। রাজধানী ঢাকার একটি ফ্ল্যাটে একাই থাকেন নীরা। বিয়ে করেননি, চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।
একা থাকতে থাকতে একসময় নিঃসঙ্গতা তাকে গ্রাস করতে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে গিয়ে নিয়মিত কাউন্সেলিংও নিতে হয় তাকে।
এরপর এক বন্ধুর পরামর্শে একদিন হঠাৎ করেই একটি বিড়ালছানা বাসায় নিয়ে আসেন। শুরুতে নিতান্তই শখের বশে। কিন্তু ছোট্ট প্রাণীটির নিয়মিত যত্ন নিতে নিতে কখন যে তার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে, তা টেরই পাননি নীরা। বিশাল ফ্ল্যাটে এখন আর নিজেকে একা মনে করেন না ৪১ বছর বয়সী নীরা।
‘ডোরা’ নামের বিড়াল ছানাকে খাবার দেওয়া, পরিচর্যা করা নীরার জীবনে এক নতুন শৃঙ্খলা ও উদ্দেশ্য এনে দিয়েছে। নিঃসঙ্গতার শূন্যতা পূরণে প্রাণীটি হয়ে উঠেছে তার প্রিয় বন্ধু।
পোষা প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্কগুলো ঠিক এমনই হয়ে থাকে। সারাদিনের কাজের ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তা নিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন। সঙ্গে সঙ্গে সে ছুটে এলো আপনাকে স্বাগত জানাতে। আপনি ফিরেছেন, এতেই যেন তার কত আনন্দ!
সে হতে পারে একটা কুকুর, বিড়াল, খরগোশ কিংবা ছোট্ট কোনো পাখি। লেজ নেড়ে, পায়ের কাছে ঘুরঘুর করে বা ডানা ঝাপটে জানায় তার ভালোবাসা।
যান্ত্রিক জীবন
শহুরে ব্যস্ততায় দিনদিন বেড়ে চলছে আমাদের সামাজিক দূরত্ব। পরিবারের সবাই মিলে বসে কুশল বিনিময়, চায়ের আড্ডা বা অসুস্থতায় পাশে বসে সঙ্গ দেওয়ার জায়গায় স্থান করে নিয়েছে যান্ত্রিক যোগাযোগ।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনমান উন্নত করেছে ঠিকই, কিন্তু একাকিত্বকেও সঙ্গী করে দিয়েছে। জীবনের নানা পরিবর্তনের কারণে আমরা অনেক সময় একা হয়ে পড়ি।
এই একাকিত্বের সঙ্গে যখন নীরবে এক মানসিক যুদ্ধ শুরু হয়, তখনই পোষা প্রাণীর সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ক জীবনে আলাদা একটা জায়গা করে নিতে পারে। সময় গড়ালে প্রাণীটি শুধু ‘পোষ্য’ থাকে না, হয়ে ওঠে পরিবারেরই একজন।
এই প্রাণীরা আমাদের নতুন করে ভালোবাসতে ও বিশ্বাস করতে শেখায়। দিন শেষে দ্রুত বাড়ি ফেরারও একটা তাড়না তৈরি হয়। কারণ ঘরে কেউ একজন আপনার অপেক্ষায় আছে।
একাকিত্ব দূর করতে পোষা প্রাণীর ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মল্লিকা রায়।
তিনি বলেন, ২০১৯ সালের মে মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে হিউম্যান অ্যানিম্যাল বন্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচএবিআরআই) ও মার্স পেটকেয়ারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
জরিপে ৮৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ঘরে একটি পোষা প্রাণী থাকলে তার সঙ্গ একাকিত্বের অনুভূতি কমাতে পারে।
৭৬ শতাংশের মতে, পোষা প্রাণীকে কেন্দ্র করে তাদের সামাজিক যোগাযোগের পরিসর বেড়েছে। আর ৭২ শতাংশ বলেছেন, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে তৈরি হওয়া বন্ধন সামাজিকীকরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পোষা প্রাণী কীভাবে একাকিত্ব দূর করে?
মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী। অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ, সঙ্গ এবং আবেগের আদান-প্রদান আমাদের মানসিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
কিন্তু একাকিত্ব বর্তমানে একটি ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যগত ও মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মল্লিকা রায় বলেন, ‘ঘরে একটি পোষা প্রাণী থাকলে তা আপনার মনে এক ধরনের ভালো লাগা তৈরি করে, মানসিক প্রশান্তি দেয়। আমাদের কিছু ভালো স্মৃতি তৈরি হয়। এরা বিশ্বস্ত ও আদুরে হয়। ওরা ওদের মালিকদের চিনতে পারে। আপনি তাদেরকে যতটা ভালোবাসবেন, এই পোষা প্রাণীগুলো তা আপনাকে কয়েক গুণ ফিরিয়ে দেবে।’
মানুষের মতো পোষা প্রাণীরা আপনার ভালো-মন্দ বিচার করে সম্পর্ক তৈরি করে না। আপনার ভুলের জন্য কটাক্ষ করে না, পুরোনো কোনো বিষয় নিয়ে অভিমান বা আক্রোশ জমিয়ে রাখে না। বরং আপনি যেমন, অনেকটা সেভাবেই আপনাকে গ্রহণ করে।
বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর তাই পোষা কুকুরটির লেজ নাড়ানো কিংবা বিড়ালটার গড়াগড়ি দিয়ে আপনাকে স্বাগত জানানো মন ভালো করে দিতে পারে। দিনের জমে থাকা চাপ কিছুটা কমে আসে। কারও কাছে যে আপনি গুরুত্বপূর্ণ, এই অনুভূতি আপনার আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
আপনার চারপাশে আরেকটি প্রাণীর উপস্থিতি আপনাকে ‘একলা’, এই অনুভূতিতে ভুগতে দেয় না।
পোষা প্রাণী শুধু নিঃসঙ্গ সময়ে পাশে থাকে না, তারা অনেকের অগোছালো জীবনেও রুটিন তৈরি করে দিতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দেওয়া, পানি বদলে দেওয়া, পরিচর্যা করা, হাঁটতে নিয়ে যাওয়া কিংবা কিছুটা সময় খেলাধুলা করা, এসব দায়িত্ব মানুষকে ব্যস্ত রাখে।
এই দায়িত্ববোধের সঙ্গে তৈরি হয় মমতা ও সহানুভূতি। প্রাণীটির প্রতি যত্ন নিতে নিতে তার সঙ্গে একটি আবেগের সম্পর্কও গড়ে ওঠে। আর সেই সম্পর্ক অনেকের জীবনের শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারে।
মল্লিকা রায়ের ভাষায়, পোষা প্রাণী অনেকটা ‘ন্যাচারাল থেরাপিস্ট’-এর মতো কাজ করতে পারে। মানুষের আবেগের পরিবর্তন তারা অনেক সময় বুঝতে পারে। মালিক মন খারাপ করে থাকলে তার কাছে গিয়ে বসে থাকা, গা ঘেঁষে থাকা কিংবা নীরবে তাকিয়ে থাকা, এসব আচরণ টনিকের মতো কাজ করে।
এছাড়া এই পোষ্যগুলো সামাজিক যোগাযোগের একটি মাধ্যমও হয়ে ওঠে। অনেকেই পোষা প্রাণীকে সঙ্গে করে বাইরে যান। সেখানে পোষ্যসহ অন্য কাউকে দেখলে কুশল বিনিময় করেন।
শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী কেউ প্রাণী পুষলে তারা নিজেরা আগ্রহ নিয়ে পরিচিত হন, কথা বলেন। আর এভাবেই সামাজিক যোগাযোগের পরিধি বাড়ে ও একাকিত্বের পরিধি ছোট হতে থাকে।
ডোরাকে নেওয়ার পর অনেক কিছুই বদলে গেছে বলে জানান নীরা।
তিনি বলেন, ‘অফিস শেষে আমি দ্রুত বাসায় ফিরতে চেষ্টা করি। ডোরা মেয়ে বিড়াল। সারাদিনের অফিসের ব্যস্ততার পরে বাসায় ফিরে ওকে দেখতে পেলেই আমার সব ক্লান্তি যেন চলে যায়।’
ঘরের তালা খোলার শব্দ পেলেই ডোরা ছুটে আসে। দরজার ওপাশ থেকে ‘ম্যাও ম্যাও’ করতে থাকে।
নীরা বলেন, ও যেন আমার সব কথা বুঝতে পারে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, আমার কখনো মন খারাপ হলে ও আমার পাশে এসে গা ঘেঁষে চুপটি করে বসে থাকে। যেন বলতে চায়, ‘মন খারাপ কোরো না, আমি আছি তো।’
এ ব্যাপারে বিজ্ঞান কী বলে?
মানুষ ও পোষা প্রাণীর সম্পর্ক শুধু আবেগের বিষয় নয়। এর পেছনে শারীরবৃত্তীয় কিছু প্রক্রিয়াও কাজ করে।
মল্লিকা রায় বলেন, পোষা প্রাণীর সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের ফলে শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়তে পারে। এই হরমোন মানসিক চাপ কমাতে, আবেগগত বন্ধন ও আস্থা বাড়াতে এবং সামাজিক আচরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমাতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। শুধু তাই নয়, এটি রক্তচাপ কমাতে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করে।





