‘অপকর্মের তথ্য’ গোপন না করে তৃণমূলকে নজরদারিতে রাখার সিদ্ধান্ত বিএনপির
তৃণমূলের কর্মীদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তা লুকিয়ে না রেখে বা অভিযুক্তদের বাঁচানোর চেষ্টা না করে দ্রুত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানানোর নির্দেশ দিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।
জেলা পর্যায়ের নেতাদেরও নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই করতে, অপকর্মে জড়িত কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করতে এবং আইনি ব্যবস্থার প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অনেক সময় কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে নেতারা তা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।'
'অনেক ক্ষেত্রে তারা নানা কারণে ব্যবস্থা নেওয়া থেকেও বিরত থাকেন। স্থানীয়ভাবে যদি তারা ব্যবস্থা নিতে নাও পারেন, তবে অন্তত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বিষয়টি জানাতে হবে,' বলেন তিনি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কোনো সমস্যা বড় ধরনের বিতর্কে রূপ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যেন প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে না দেয় এবং দল ও সরকারকে চাপে ফেলতে না পারে সেজন্যই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
বিএনপি নেতারা জানান, দল চায় না জেলা কমিটি শুধু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করুক। দল চায় স্থানীয় নেতারা নিজ এলাকার নেতাকর্মীদের ওপর কড়া নজর রাখুক এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রাথমিক ব্যবস্থা নিক।
তাই দলের নাম ব্যবহার করে অন্যায় প্রভাব খাটানো বা ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া, জমি বা প্রতিষ্ঠান দখল, চাঁদাবাজি এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো অভিযোগগুলোর বিষয়ে জেলা পর্যায়ের নেতাদের বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত তৃণমূলে এই নির্দেশনাগুলো মৌখিকভাবে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। কারণ, দলের চেয়ারম্যান সময়ে সময়ে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন।'
'সবাই অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছেন। কেউ অন্যায় কোনো কাজ করলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি,' বলেন তিনি।
বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, জেনে-বুঝে অভিযোগ লুকিয়ে রাখলে বা কোনো অভিযুক্ত সদস্যকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে জেলা পর্যায়ের নেতারাও শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।
যারা দায়মুক্তি দিচ্ছে, অভিযোগের কথা জেনেও ব্যবস্থা নেয়নি এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ গোপন করার চেষ্টা করেছেন—দল তাও খতিয়ে দেখতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা ডেইলি স্টারকে জানান, অনেক এলাকায় এখনো দলীয় কোন্দল সাধারণ ঘটনা। প্রায়ই এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলে।
তাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পাঠানোর আগে অভিযোগগুলো যাচাই করা উচিত বলে তারা মনে করেন।
মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি'র গতকাল প্রকাশিত শনিবার প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরে ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৩৫টিই ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল সংশ্লিষ্ট।
মিরপুর-১ নম্বরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনার পর দলের শৃঙ্খলার বিষয়ে বিএনপির কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়।
ওই ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বেশ কয়েকজন স্থানীয় নেতার নাম আসায়, শৃঙ্খলাভঙ্গ, সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ড ও অনৈতিক আচরণের দায়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের ঢাকার ৩ গুরুত্বপূর্ণ কমিটি বিলুপ্ত করা হয় এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।
মিরপুরের সাবেক কাউন্সিলর সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পদত্যাগ করেন।
বিএনপি নেতারা জানান, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করে তৃণমূলের অভিযোগগুলো উপেক্ষা করলে পরে পুরো দলকে এর খেসারত দিতে হতে পারে।
জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স ডেইলি স্টারকে বলেন, জনস্বার্থ ও শান্তি-শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ করলে দলের ভেতরের বা বাইরের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
দলের নাম ভাঙিয়ে কোনো অন্যায় কাজ করলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, 'কয়েকজন রাজনীতিবিদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে দলের লাখো নেতাকর্মী বিব্রত ও মর্মাহত। এগুলো সহ্য করা হবে না।'
এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, গত ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী একটি স্পষ্ট ও কড়া বার্তা দিয়েছেন—যারা তার উদারতাকে দুর্বলতা ভেবে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন, জননিরাপত্তা ও জনকল্যাণে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে যারা বাধা হচ্ছেন, তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না।
দলের হাইকমান্ড পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে জানিয়ে তিনি স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে ও আলোচনার মাধ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ছোটখাটো অভিযোগে কোনো নেতাকে প্রথমে সতর্ক করা বা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হতে পারে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে পদে রদবদল বা বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, 'এই বিধানগুলো সবসময় যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। সে কারণেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে এখন এসব নির্দেশনা নতুন করে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং স্থানীয় কমিটিগুলোকে কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।'