শিশুর বিকাশে স্ক্রিন টাইমের ৪ ক্ষতিকর প্রভাব
আধুনিক সমাজে শিশুর বেড়ে ওঠা অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে গেছে। আগেকার শৈশবের সেই কোলাহলের এখন আর দেখা মেলে না। দেশীয় ঐতিহ্যের গ্রামীণ খেলাগুলো যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সঙ্গে হারিয়ে গেছে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে স্মার্টফোন। কেন বলছি এসব? কারণ আজকের পৃথিবীতে শিশুরা এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে, যেখানে সর্বত্র স্ক্রিনের রাজত্ব। ড্রয়িংরুম, ক্লাসরুম, গাড়ি, এমনকি খাবার টেবিলও স্ক্রিনের দখলে।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে স্ক্রিন টাইমের ব্যবহার দরকার আছে। কিন্তু তা হতে হবে নিয়ন্ত্রিত। যখন স্ক্রিন টাইম বেশি হয়ে যায় তখন সময় একঘেয়ে হয়ে ওঠে বা ঘুম, খেলাধুলার জায়গা দখল করে নেয়। এটাই মূল আশঙ্কার জায়গা। তখন এর প্রভাব কেবল স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং শিশুর সার্বিক বিকাশে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের কম ঘুম, দেরিতে কথা বলা, মনোযোগের সমস্যা এবং শারীরিক সক্রিয়তার সম্পর্ক আছে।
আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘুম
স্ক্রিন টাইম শিশুদের ঘুমের ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৯ সালের নির্দেশনায় ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্ক্রিনভিত্তিক কার্যক্রম সীমিত রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, বিশেষ করে ঘুমানোর ঠিক আগে স্ক্রিন ব্যবহার করলে শিশুদের ঘুমের সময় কমে যায়। কেবল তাই নয় ঘুমের সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যায়।
ঘুমানো মানে কেবল বিশ্রাম নয়, এটি শরীর ও মস্তিষ্ক গঠনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। যখন শিশুরা রাত জেগে স্ক্রল করে, ভিডিও দেখে বা গেম খেলে, তখন তাদের ঘুমের পরিমাণ কমে যায়, গভীর ঘুম হয় না। এর ফলে শেখার ক্ষমতা, মেজাজ নিয়ন্ত্রণ ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমানোর আগে এক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করলে শিশুদের ঘুম ও মনোযোগে সরাসরি প্রভাব পড়ে।
ভাষা শেখার গতি কমতে পারে
স্ক্রিন টাইম শিশুদের শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম মানুষের সঙ্গে কথা বলার পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
জেএএমএ পেডিয়াট্রিকস জার্নালের ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্রিন টাইম যত বেশি হয় শিশুর সঙ্গে বাবা-মায়ের কথা তত কম হয়। এতে বড়দের শব্দ শুনে শব্দ শেখা, শিশুর আওয়াজ করা এবং পারস্পরিক কথা বলা কমে যায়। অথচ শিশু ভাষা শেখে পারিবারিক কথোপকথন থেকে, একা স্ক্রিন দেখে নয়।
আরও গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলায় বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে যোগাযোগ দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক আছে।
এছাড়া বয়সের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কনটেন্ট দেখা বা বাবা-মায়ের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারও শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মনোযোগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়
যখন শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে দ্রুতগতির ও অ্যাডভেঞ্চার কনটেন্ট দেখে, তখন তাদের মস্তিষ্ক সেই অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে বাস্তব জীবনের ধীরগতির কাজগুলো তাদের কাছে বিরক্তিকর বা কঠিন মনে হতে পারে।
জেএএমএ পেডিয়াট্রিকস জার্নালে বলা হয়, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের আচরণ ও মানসিক স্থিতিশীলতায় সমস্যা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যদি স্ক্রিন ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না থাকে।
এর সঙ্গে ঘুমের সমস্যাও জড়িত। যারা ঠিকমতো ঘুমায় না, তারা অস্থির, খিটখিটে ও মনোযোগহীন হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ, স্ক্রিন টাইম এক ধরনের দ্বিমুখী সমস্যা। এটি ঘুমের পরিমাণ কমায় এবং আচরণেও প্রভাব ফেলে।
খেলাধুলা কমে যায়
সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষতির একটি হলো, স্ক্রিন শিশুদের খেলাধুলার জায়গা দখল করে নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য খেলাধুলা, সক্রিয় থাকা এবং ভালো ঘুম খুবই জরুরি।
কিন্তু যখন স্ক্রিন টাইম বাড়ে, তখন খেলাধুলা কমে যায়। এর ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়, ফিটনেস কমে যায় এবং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি স্ক্রিন টাইম ও শারীরিক সক্রিয়তা কম থাকলে কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে। সহজভাবে বললে, স্ক্রিন কেবল সময় কেড়ে নেয় না, এটি আমাদের অজান্তে শিশুদের শারীরিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।